ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি: ইরান যুদ্ধে মিত্রদের সমর্থন না পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহারের মুখে
প্রায় আট দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত সামরিক জোট ন্যাটো নিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ নতুন করে প্রকাশ পেয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর সমর্থন না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে জোট থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই অবস্থান ন্যাটোর অস্তিত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ট্রাম্পের ন্যাটো বিরোধিতার ইতিহাস
২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়ার আগে থেকেই ন্যাটোকে ‘সেকেলে’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, ন্যাটো সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। তিনি ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং জোটভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর তহবিল কম জোগানো নিয়ে বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্পের ন্যাটো বিরোধিতা আরও বেড়েছে। এ বছরের শুরুতে ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য বলপ্রয়োগের হুমকি দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয়ই ন্যাটো সদস্য হওয়ায় নিজেদের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হুমকি থেকে সরে এলে সে যাত্রায় সংকট এড়ানো সম্ভব হয়।
ন্যাটোর জন্ম ও বিবর্তন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয় ন্যাটো। ৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনে ১২টি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। প্রাথমিক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও ডেনমার্ক।
ধীরে ধীরে আরও দেশ এ জোটে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ন্যাটোর সদস্য সংখ্যা ৩২। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে সুইডেন জোটে যোগ দেয়। ন্যাটোর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থিত। বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুতে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ
প্রথম মেয়াদ থেকেই ট্রাম্পের মূল অভিযোগ ছিল ন্যাটোর মিত্রদের অপর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়। ২০১৪ সালের একটি চুক্তিতে সদস্যদেশগুলোর জিডিপির ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু অধিকাংশ দেশ এটি পূরণ করত না।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ন্যাটোর প্রায় সব সদস্যদেশ সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যহারে বাড়ায়। ২০২৪ সালে তাদের গড় ব্যয় ছিল জিডিপির ২.৭ শতাংশ। তবে ট্রাম্পের নতুন লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৫ শতাংশ।
গত বছর বার্ষিক সম্মেলনে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করতে সম্মত হয়। ২০৩৫ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জিডিপির ৫ শতাংশ দুই ভাগে ভাগ করা হবে। সাড়ে ৩ শতাংশ বরাদ্দ হবে মূল প্রতিরক্ষা খাতে এবং দেড় শতাংশ ব্যয় করা হবে সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে।
ইরান যুদ্ধ ও ন্যাটোর ভূমিকা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ংকর এক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়।
এটি খুলতে সহযোগিতার জন্য মিত্রদেশগুলোকে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু তারা সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। উল্টো স্পেন, ইতালি ও ফ্রান্স এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
এ নিয়ে ট্রাম্প আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনসহ সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি।’ যুদ্ধে দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্রদের অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউস ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছে।
ন্যাটো চুক্তির আর্টিকেল ৫
ন্যাটো চুক্তির আর্টিকেল ৫–এ বলা আছে, জোটভুক্ত কোনো দেশ যদি বিদেশি শক্তির আক্রমণের শিকার হয়, তাহলে জোটের সব সদস্যদেশ একযোগে তা প্রতিহত করবে। ইতিহাসে মাত্র একবার আর্টিকেল ৫ কার্যকর করা হয়েছিল, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ কেবল তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হয়। তাই এটি ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কারণ, এ যুদ্ধ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের সম্ভাবনা
২০২৩ সালের শেষ দিকে মার্কিন কংগ্রেস এক ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ন্যাটো থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নতুন নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট ছাড়তে হলে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
ন্যাটো নেতারা এবং বিশেষ করে বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুতে ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে চেষ্টা করবেন যে এই জোটে থাকা ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন। রুতে ‘ট্রাম্প হুইস্পারার’ হিসেবে পরিচিত এবং তিনি ট্রাম্পকে বাগে রাখতে গোপনে ও প্রকাশ্যে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গ্রিনল্যান্ড দখলের অনড় অবস্থান থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে নিতে রুতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে মনে করা হয়। ইরান যুদ্ধ শেষে ট্রাম্প ও ন্যাটোর সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, বিশ্ব সেটা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।



