ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমনে অসন্তোষ যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই মুহূর্তে তেহরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর ওয়াশিংটনের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। এই ঘটনা কেবল সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, বরং ইরানের আকাশসীমায় ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের দাবিকেও বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিমান ভূপাতিতের ঘটনা ও ক্রু সদস্যদের অবস্থা
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে ভূপাতিত হওয়া প্রথম যুদ্ধবিমানের দুজন ক্রু সদস্যের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে অন্যজনের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত থেকে গেছে। এর পরপরই শুক্রবার দ্বিতীয় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান আক্রান্ত হওয়ার খবর আসে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাইলট কোনোমতে বিমানটিকে ইরানি সীমান্তের বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন এবং ইজেক্ট করার পর তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ও বাস্তবতার পার্থক্য
ইরানের আকাশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ এবং সেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই— এমন দাবি করে গত ৪ মার্চ প্রতিরক্ষাসচিব হেগসেথ বলেছিলেন, ইরানের আকাশ এখন ‘আনকন্টেস্টেড এয়ারস্পেস’ এবং ইরান কিছুই করতে পারবে না। এছাড়া গত ২৪ মার্চ ট্রাম্প গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আমাদের বিমান তেহরানের ওপর দিয়ে উড়ছে, ওরা কিচ্ছু করতে পারছে না। ওদের রাডার ১০০ ভাগ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’
ঘটনার প্রভাব ও সামরিক বিশ্লেষণ
কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে দুটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করছে যে, পেন্টাগনের দাবি যতটা না বাস্তবসম্মত ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল প্রচারণাধর্মী। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বহুগুণ এগিয়ে থাকলেও এই ঘটনা ‘অসম যুদ্ধের’ ভয়াবহতাকে সামনে এনেছে। মার্কিন জনগণ ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দা মার্কিনিদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে।
অতিরঞ্জনের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্য অতিরঞ্জিত করার অভিযোগ নতুন নয়। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাদের কর্মসূচি ‘পুরোপুরি মুছে ফেলা’ হয়েছে। কিন্তু ৯ মাস পরেই প্রশাসন আবার ইরানকে ‘পারমাণবিক হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরে। এছাড়া সিএনএনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ইরানের মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করার যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন তা অতিরঞ্জিত; আসলে রেভল্যুশনারি গার্ডের সক্ষমতার অর্ধেকই এখনো অক্ষত রয়েছে।
প্রতিরক্ষাসচিব হেগসেথ সংবাদমাধ্যমকে ‘ফেক নিউজ’ বলে তুচ্ছজ্ঞান করে আসছিলেন এবং দাবি করছিলেন, কোনো স্থলসেনা ছাড়াই তারা ইরানের আকাশ ও জলপথ দখল করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে— সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ (হরমুজ) এখনো অচল এবং ইরানের আকাশসীমাও মার্কিন বাহিনীর জন্য নিরাপদ নয়। এই সংকট মার্কিন যুদ্ধ কৌশল ও জনসমর্থনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।



