শান্তি আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাহিনীর মধ্যে বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলা চালানো হয়েছে। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এই উত্তেজনাপূর্ণ সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলা হলেও যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে ইরানও বলেছে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে যেকোনো সময় আবার সংঘাত শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শান্তি প্রস্তাবের জবাব অপেক্ষায়
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান জানিয়েছে, তারা এখনো প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব দেবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, তাঁরা শুক্রবারের মধ্যে ইরানের জবাব পাওয়ার আশা করছেন। সেই জবাবের ভিত্তিতে পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সৌদি আরব ও কুয়েতের সমর্থন
এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরব ও কুয়েত হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডমে’ যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। এর অর্থ হলো, এ অভিযান পরিচালনার জন্য দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে।
হরমুজে পাল্টাপাল্টি হামলা
ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি তেলবাহী ট্যাংকার ও একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের দ্বীপাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকাতেও বিমান হামলা হয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কেশম দ্বীপ, বন্দর খামির এবং সিরিক এলাকায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চল ও চাবাহার বন্দরের দক্ষিণে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পাল্টা হামলায় মার্কিন বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের একটি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হামলায় ১০ জন নাবিক আহত হয়েছেন এবং ৫ জন এখনো নিখোঁজ।
মার্কিন বাহিনীর দাবি
ইরানের হামলার পাল্টা জবাব দিতেই তাদের সেনারা হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, ইরান তিনটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট নৌযান ব্যবহার করেছিল। তবে এসব হামলায় কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সেন্টকম আরও জানিয়েছে, তারা ইরান-সংশ্লিষ্ট ৭০টির বেশি জাহাজকে বাধা দিয়েছে। এসব বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে ইরানের প্রায় ১৬৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন সম্ভব ছিল, যার বাজারমূল্য ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
ট্রাম্পের হুমকি ও বক্তব্য
সেন্টকমের অনুসরণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের হামলায় তাদের তিনটি ডেস্ট্রয়ার সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মার্কিন বাহিনী দ্রুত জবাব দিয়ে হামলাকারী নৌযান ধ্বংস করে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সহজে ভূপাতিত করা হয়েছে। হামলা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে। ট্রাম্প ইরানকে দ্রুত আলোচনায় বসে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, যদি চুক্তি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
যখনই কোনো ‘কূটনৈতিক সমাধান আলোচনার টেবিলে আসে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া সামরিক অভিযানের’ পথ বেছে নেয় বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে হরমুজে পাল্টাপাল্টি হামলার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, ‘এটা কি কেবল চাপ প্রয়োগের একটি কৌশল? নাকি কোনো ষড়যন্ত্রকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরেকটি জটিল সংকটে জড়িয়ে ফেলছে?’
প্রস্তাবের জবাবের অপেক্ষা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার ইতালির রাজধানী রোমে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুক্রবারের মধ্যে ইরানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবের জবাব পাবে বলে আশা করছে। যুদ্ধ শেষ করার জন্য আমরা এ প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা দেখব জবাবে কী আছে। আমাদের আশা, এতে এমন কিছু থাকবে, যা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দিকে নিয়ে যাবে। আমাদের জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে কড়া জবাব দেওয়া হবে।’
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখছে। হরমুজ প্রণালিতে বৃহস্পতিবার রাতে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রসঙ্গ তুলে ইসমাইল বাঘাই বলেন, ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ইরানের বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা যেকোনো ‘আগ্রাসন ও দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের’ জবাব দিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ দফা প্রস্তাব
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ১৪ দফা প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। তাদের অন্তত ১২ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম ওয়াশিংটনের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, ইরানের আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলার সম্পদ মুক্ত করে দেবে এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের রাজনীতিবিশেষজ্ঞ নেগার মরতাজাভি আল-জাজিরাকে বলেন, সংঘাত শেষ হলে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করার সম্ভাবনা খুবই কম।
আবারও শুরু হচ্ছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি কর্মকর্তাদের বরাতে জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালিতে প্রজেক্ট ফ্রিডম আবার শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ অভিযানের মাধ্যমে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমানবাহিনী। গত সোমবার এ অভিযান শুরুর ৩৬ ঘণ্টা পর স্থগিত করা হয়েছিল। তখন ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করা হয়েছে। তবে ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ চলবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এখন প্রজেক্ট ফ্রিডম আবার শুরুর পরিকল্পনা করছেন। কিছু মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এ সপ্তাহেই অভিযানটি আবার শুরু হতে পারে।



