কুড়িগ্রামে দুধকুমার নদের পানি বিপদসীমার ওপর, স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা
কুড়িগ্রামে দুধকুমার নদের পানি বিপদসীমার ওপর, বন্যার শঙ্কা

কুড়িগ্রামে উজানের ঢলে দুধকুমার নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমবার (২৯ জুন) সকালে পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়, যা দিনভর বেড়ে সন্ধ্যা ৬টায় বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নদ তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু পরিবারের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে।

বন্যা পরিস্থিতির পূর্বাভাস

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় দুধকুমার, তিস্তা ও ধরলা নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ সময় দুধকুমার নদের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি সব পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী তিন দিন জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

বৃষ্টিপাত ও নদীর অবস্থা

আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যের বরাতে বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, সোমবার দুধকুমার অববাহিকার পাটেশ্বরীতে সর্বোচ্চ ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন দেশের অভ্যন্তরে রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও আসাম প্রদেশে ভারী থেকে অতিভারী এবং পরবর্তী তিন দিন মাঝারি ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, আগামী তিন দিন রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলা সংলগ্ন এসব নদীর নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পানিবন্দি পরিবার ও কৃষিজমির ক্ষতি

দুধকুমারের পানি বেড়ে বিপদসীমা অতিক্রম করায় নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙা ও রায়গঞ্জ ইউনিয়নের ফান্দেরচর এলাকার নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বামনডাঙা ইউনিয়নের মালিয়ানিরপার এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একটি অসম্পন্ন অংশ দিয়ে তীরসংরক্ষণ কাজের জিও ব্যাগের স্তূপ উপচে কৃষিজমিতে পানি প্রবেশ করেছে।

পাউবো বলছে, স্থানীয়দের বাধা ও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির প্রায় ৩০০ মিটার অংশের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ওই অংশে বাঁধ নেই। ওই স্থানের প্রায় ৩০ মিটার অংশ দিয়ে প্রতিরক্ষা কাজের জিও ব্যাগ উপচে পানি প্রবেশ করছে।

পানি বেড়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি, তিলাই, চর ভূরুঙ্গামারী, পাইকেরছড়া, সোনাহাট ও আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়ন এবং নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙা, কেদার, বল্লবেরখাস ও কালীগঞ্জ ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকার নিম্নাঞ্চলের আমন বীজতলা, পাট ও সবজি ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত ও ঢলের পানিতে সদর ও রৌমারী উপজেলাতেও বেশকিছু বীজতলা, পাট ও সবজি ক্ষেত নিমজ্জিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলায় ৪৬ হেক্টর সবজি ক্ষেত, ৩৬ হেক্টর আমন বীজতলা ও ৮৪ হেক্টর পাট ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য বাড়তি সতর্কতা ও পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা ইউনিট। সোমবার এক বার্তায় তারা জানায়, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতিতে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি উঁচু জায়গায় রাখতে হবে। পুকুরের চারপাশ উঁচু করে দিতে হবে। সম্ভব হলে চারপাশে জাল বা বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘিরে দিতে হবে যাতে বন্যার পানিতে মাছ ভেসে না যায়।

এতে আরও বলা হয়েছে, বন্যা শুরুর আগেই জমি থেকে দ্রুত পরিপক্ব ফসল কিংবা সবজি তুলে ফেলতে হবে। কলা এবং সবজি গাছের জন্য খুঁটির ব্যবস্থা রাখতে হবে। জমির আইল উঁচু করে রাখতে হবে। পাশাপাশি ফসলের জমি থেকে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ছাড়াও বন্যাকালীন সেচ, সার এবং বালাইনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলেছে কৃষি বিভাগ।

প্রশাসনের প্রস্তুতি

পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। বামনডাঙা ইউনিয়নে দুধকুমারের ডান তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। স্থানীয়দের বাধায় জমি অধিগ্রহণ করতে না পারায় সেখানে বাঁধের কাজ শেষ করা যায়নি। অসম্পন্ন ওই অংশ দিয়ে পানি উপচে কৃষি জমিতে প্রবেশ করছে।’

জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। উদ্ধারকারী নৌকা, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’