সৌদি আরব ও ওমানকে ইরান জানিয়েছে, তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) ‘কঠোর নিশানা’ করার পরিকল্পনা করছে। দৃশ্যত এটি আবুধাবি ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করার একটি পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ইরানের পাল্টা হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আরব আমিরাত
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর তেহরানের সবচেয়ে বেশি পাল্টা হামলার শিকার হয়েছে আরব আমিরাত। ইরানের পাল্টা আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটি। সর্বশেষ আজ মঙ্গলবার ভোরে আরব আমিরাতের ফুজাইরা পেট্রোলিয়াম স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ফুজাইরার মিডিয়া অফিস দাবি করেছে, ইরান থেকে ড্রোন হামলার পর আমিরাতের পেট্রোলিয়াম শিল্প এলাকায় ‘বড় আগুন লেগেছে’। তবে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার বিষয়ে কিছু জানায়নি। এতে মনে হচ্ছে, আরব দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতের ওপর ইরানের ক্ষোভ বেশি।
সৌদি আরবের সাথে আরব আমিরাতের উত্তেজনা
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে উত্তেজনা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো অপ্রকাশ্যে তাদের উত্তেজনার খবর চাউর হয়। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে আরব আমিরাত। সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে যে উত্তেজনা রয়েছে, এটি তার সর্বশেষ লক্ষণ। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ রিয়াদ ও আবুধাবিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইরানের পরিকল্পনা: আমিরাতকে গুঁড়িয়ে দেওয়া
এক আলাপচারিতায় ইরানি কর্মকর্তারা সৌদি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তাঁরা আমিরাতকে ‘গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ পরিকল্পনা করছেন। তাঁরা বিশেষভাবে আবুধাবির সঙ্গে রিয়াদের বিরোধের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আলাপচারিতার সঠিক সময় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা না হলেও বলা হয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা ইরানের এমন আক্রমণাত্মক ভাষার সমালোচনা করেছেন। ইরানের প্রতি সৌদি আরবের ক্ষোভ থাকলেও দুই দেশ সংলাপ বজায় রেখেছে। গত মাসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
ইরানের এই সতর্কতাগুলো প্রমাণ করে, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার ফাটল সম্পর্কে সচেতন। যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার এই আরব রাজতন্ত্রগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেওয়াকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখছে ইরান।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সৌদি আরব এই অঞ্চলের বৃহত্তম দেশ। আরব আমিরাতের মতো তাদেরও দেশের বাইরে প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেই সৌদি আরব যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে আমিরাতের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। এমনকি সুদানের গৃহযুদ্ধেও দুই দেশ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধের এই সময়েও কোনো দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে চাল চালতে পিছপা হয়নি। মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে প্রকাশিত হয়েছে, সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তান থেকে পাঠানো অস্ত্রের চালান গত মার্চে পূর্ব লিবিয়ার খলিফা হাফতারের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এই হাফতারের বাহিনীকে রিয়াদ প্রতিদ্বন্দ্বী আরব আমিরাতের প্রভাব থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান
সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক সরকারগুলো সাধারণত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরানের পাল্টা হামলার ধাক্কা তাদেরই বেশি সইতে হয়েছে। আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত দুই হাজার ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এই ছোট কিন্তু ধনী দেশটিকে নিশানা করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েত—এসব দেশে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এসব দেশ মার্কিন প্রতিরক্ষাশিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রই তাদের অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রধান সরবরাহকারী। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা না করার অনুরোধ উপেক্ষা করায় এই অঞ্চলের দেশগুলো হতাশ হলেও তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পাশেই দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু দেশের অবস্থান অন্যদের তুলনায় বেশি কঠোর।
সৌদি আরব তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ এবং আকাশসীমা উন্মুক্ত করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে তারা তাদের ঘনিষ্ঠ অংশীদার পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকেও সমর্থন করেছে। বিপরীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যাওয়ার তদবির করেছে এবং পাকিস্তান যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে না পারে, সেই চেষ্টাও করেছে।
আরব আমিরাত-ইসরায়েল জোট
এই যুদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের অংশীদারত্বকে আরও মজবুত করেছে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলার সময় ইসরায়েল আমিরাতকে লেজার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও অন্যান্য উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এমন জল্পনাও রয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরান আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। গত মাসে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শিরাজ এলাকায় একটি চীনা ‘উইং লুং ২’ ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের অভ্যন্তরে আরব আমিরাত বিমান হামলা চালাচ্ছে কি না।
আমিরাতের ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ইরানের হামলার মুখে আমিরাত বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এখানেই সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক যাতায়াত করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুবাই পর্যটন, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। দুবাইয়ের বেশ কিছু নামী হোটেল এখন মূল্যছাড় দিচ্ছে। কারণ, সেখানে পর্যটকের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। শহরের অন্যতম বিখ্যাত হোটেল ‘বুর্জ আল আরব’ সংস্কারের জন্য ১৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের একটি গোলার আঘাতে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এত ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার দেশ হিসেবে আরব আমিরাত আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমিরাত ভয় পাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে তাদের মাঝপথে ফেলে চলে যাবে। কারণ, ইরান তাদের দোরগোড়ায় এক নতুন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষমতা রাখে।
এর আগে মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বলেছেন, এই যুদ্ধ ৯ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হলেও সেই প্রস্তুতি আবুধাবি নিয়ে রেখেছে।



