মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার জরুরিভাবে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা) ঋণের সন্ধান করছে। গত মার্চ থেকে আগামী জুন মাস পর্যন্ত সময়ের জন্য বাজেট সহায়তা হিসেবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এই ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ঋণের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)কে চিঠি দিয়ে ঋণ সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করতে বলেছে। চিঠির সঙ্গে পাঠানো একটি অবস্থানপত্রে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সৃষ্ট চাপের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ঋণ তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে:
- বৈদেশিক মুদ্রার মজুত স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করা।
- নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সময়োপযোগী সহায়তা প্রদান করা।
- জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে ব্যয় করা।
আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজির দাম ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে জ্বালানি ও সার আমদানিতে ৩০১ কোটি ডলার ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও চলতি বছরের একই সময়ে এই ব্যয় বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
এছাড়া মার্চ-জুন (২০২৬) সময়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা, যেখানে বাজেটে ভর্তুকির বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থানপত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের বর্তমান পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি থাকলেও মার্চ মাসে তা কমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এই হিসাব আইএমএফ নির্দেশিত বিপি ৬ পদ্ধতিতে করা হয়েছে।
ঋণের জন্য যোগাযোগ ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা
জরুরি ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। অতীতেও বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছিল, তবে সে সময় উন্নয়ন সহযোগীরা বিভিন্ন সংস্কারের শর্তারোপ করেছিল। কিছু শর্ত বাস্তবায়িত হলেও অনেকগুলোই অপূর্ণ রয়ে গেছে, যা নতুন ঋণ সহায়তা প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, আইএমএফের মতো সংস্থাগুলো জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো খাতে সবার জন্য ভর্তুকি দেওয়ার নীতির বিরোধী। এই প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থানপত্রে স্পষ্ট করে বলেছে যে, এই ভর্তুকি হবে স্বল্পমেয়াদি এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী। পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা চাইছে, তাই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি মনে করেন, উন্নয়ন সহযোগীরা নিশ্চয়ই জানতে চাইবে যে সরকার কী ধরনের নীতি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়নি কেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। বাড়তি দরে আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দ্রুত হ্রাস পেয়ে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার থেকে নেমে ২ হাজার কোটি ডলারের নিচে চলে আসে। ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়, ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এর গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল মাত্র ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এর মাত্র ১০ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের শিকার হয় ইরান। ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ।
বাংলাদেশ সময় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও হরমুজ প্রণালি এখনো খোলা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুদ্ধবিরতি শেষ হলেও শিগগিরই জ্বালানির দাম আগের পর্যায়ে ফিরে যাবে না, কারণ যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নতুন সরকার জরুরি ঋণের সন্ধানে নামতে বাধ্য হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৩১ মার্চ স্পষ্ট করে বলেছেন যে তিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন। এই সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে বাড়তি ঋণ চাওয়ার কথাও রয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ে ৯ এপ্রিল একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সমতুল্য। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ গ্রহণ সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



