সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, উচ্চ আদালতের আশ্রয়ই বিকল্প
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী অনুমোদন পেয়েছে, যার ফলে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে। তবে, আইনজীবীরা বলছেন, দলটি চাইলে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমে ফিরতে পারেন।
অধ্যাদেশ থেকে বিল: সংশোধনীর ধারাবাহিকতা
২০২৫ সালের ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনে জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তখন সংসদ কার্যকর না থাকায় আইনটি অধিকতর সংশোধন করে আশু ব্যবস্থা নিতে সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গত বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। কিন্তু, পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।
আইনজীবীদের মতামত: উচ্চ আদালতই পথ
এ অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তাদের কার্যক্রমে ফিরে আসতে চাইলে আইনি পথ অনুসরণ করতে পারেন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে নয়, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। তারা কার্যক্রমে ফিরতে চাইলে তাদের সামনে আইনগত পদক্ষেপ হচ্ছে উচ্চ আদালতে রিট করা। সেই রিটে তাদের অনেক যুক্তি থাকতে পারে।”
অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, “বিল পাস করে দলটির (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূলত, আইন দিয়ে তো এসব নিষিদ্ধ করা যায় না। নাগরিকদের তার পছন্দমতো সংগঠন করার সুযোগ সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কাজেই এই আইন যখন আদালতে যাবে, তখন এটি বাতিল হবে। আইন করে এভাবে সংগঠন নিষিদ্ধ সরকার করতে পারে না।”
বিলের মূল বিধানসমূহ
পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে:
- কোনও ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে।
- উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনও মাধ্যমে কোনও ধরনের প্রচারণা অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসমক্ষে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করবে।
সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ‘সংগঠনের স্বাধীনতা’ মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে, “জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।” তবে শর্ত থাকে যে, কোনও ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করার কিংবা এর সদস্য হওয়ার অধিকার থাকবে না, যদি তা সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশে গঠিত হয় বা সংবিধানের পরিপন্থি হয়।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, “এখানে আদালতের ক্ষমতা আছে মৌলিক অধিকার পরিপন্থি বা লঙ্ঘন হলে হস্তক্ষেপ করার। সেটা আদালতে গেলে (রিট দায়ের করলে) তা বাতিল হয়ে যাবে। একমাত্র কোনও দল বা সংগঠন যদি রাষ্ট্রদ্রোহীতামূলক কাজ করে, তবেই তাদের নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার এক অস্বাভাবিক সময়ে নিষিদ্ধ করেছিল, তখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু, সেটা এখন করা ঠিক না। তাহলে এর ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে ভালো সুফল বয়ে আনবে না।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য সমাধান
অ্যাডভোকেট মামুন মাহবুব মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- দুটি দলে যোগ-বিয়োগ করে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এদের পক্ষেই থাকে, ঘুরেফিরে ভোট দেয়। তাই বিএনপি সরকার চাইলে তাদের সিদ্ধান্ত (আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের) রিভিউ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক আলোচনা উভয় পথই খোলা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



