পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালতে শোক ও আতঙ্ক
পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আদালতে শোক

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণে মঙ্গলবার (২ জুন) আদালতজুড়ে নেমে আসে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের আবহ। একের পর এক সাক্ষীর বর্ণনায় উঠে আসে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা। বিশেষ করে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে আদালতে উপস্থিত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সাক্ষ্যগ্রহণের শুরু

আদালতের দুপুরের বিরতির পর এজলাসে শুরু হয় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ। এর আগে ১০ জন সাক্ষীর বক্তব্য শোনেন আদালত। তবে ১১তম সাক্ষী এসআই মো. ইকবাল হোসেনের বর্ণনা পুরো আদালতকেই স্তব্ধ করে দেয়।

এসআই ইকবালের বর্ণনা

তিনি আদালতকে জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তিনিই রামিসার মরদেহের সুরতহাল করেন এবং ঘটনাস্থল থেকে আলামত উদ্ধার করেন। তিনি বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে একটি জর্জেটের ওড়না উদ্ধার করা হয়, যা দিয়ে শিশুটির মুখ বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছিল। বাথরুমে রক্তমাখা একটি বালতির ভেতর পাওয়া যায় রামিসার কাটা মাথা। লাশ গুমের উদ্দেশ্যে শিশুটির দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়। মাথা শরীর থেকে আলাদা করার পাশাপাশি যৌনাঙ্গও ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভয়াবহ এসব বর্ণনা দিতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এসআই ইকবাল হোসেন। তার কান্নায় আদালতের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থিত আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। পরে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে আদালত তাকে পরে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্য

এরপর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নসরত জাবীন সাক্ষ্য দেন। তিনি আদালতকে জানান, ২০ মে দুপুর সোয়া ১টার দিকে তিনি রামিসার মরদেহ গ্রহণ করেন। মরদেহের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং হাত-পাও আলাদা করা হয়েছিল। শরীরজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুই ঠোঁট কাটা ছিল এবং বুকের বাম পাশে আঘাতের দাগ পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শিশুটির গোপন অঙ্গের অবস্থা, যেখানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর ক্ষত তৈরি করা হয়েছিল।

জেরার সময় তিনি জানান, পুরো ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে এবং তিনি নিজেই তা সম্পন্ন করেন।

ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য

পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদ সাক্ষ্য দেন। তিনি আদালতকে জানান, আসামি তার কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জেরায় আসামিপক্ষ জানতে চায়, জবানবন্দি দিলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে— এই কথা তাকে বলা হয়েছিল কিনা। জবাবে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, “হ্যাঁ।”

এসআই ইকবালের পুনরায় সাক্ষ্য

পরে আবার সাক্ষ্য দেন এসআই মো. ইকবাল হোসেন। তিনি আদালতে জব্দ তালিকা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল সেই বালতি, যেখানে রামিসার কাটা মাথা রাখা হয়েছিল। এছাড়া উদ্ধার করা হয় মেইন গেটের লক, কক্ষের জানালার গ্রিল, জর্জেটের ওড়না, রামিসার জুতা ও জামাকাপড়।

তিনি জানান, সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে সুরতহাল শুরু করা হয় এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তা চলে। জেরার সময় তাকে উদ্ধার করা ছুরির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ছুরিটিতে কোনও লেখা ছিল কিনা তা জানা নেই। ছুরিটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১১ ইঞ্চি এবং এটি শয়নকক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়।

কুইক রেসপন্স টিমের সাক্ষ্য

এদিন কুইক রেসপন্স টিমের সদস্য এসআই রাশেদুলও সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, “পল্লবীতে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা অহিদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।”

তিনি আদালতকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি স্বীকার করে যে, রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে দেহ থেকে মাথা আলাদা করা হয় এবং যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় তারা।

তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য

সবশেষে তদন্ত কর্মকর্তা এএসআই অহিদুজ্জামান আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, “২০ মে মামলা হওয়ার পর তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি আসামিদের থানাহাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। একই দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।”

তিনি আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ১ নম্বর আসামি স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হয় এবং পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “ডিএনএ রিপোর্টে দেখা গেছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আসামিরা একই ফ্লোরে বসবাস করতেন। কমন বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। উপর্যুপরি আঘাতে রামিসা নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয় এবং গোপন অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “রামিসার মা বারবার ডাকাডাকি করলেও আসামিরা দরজা খোলেনি। বরং তখনও তারা লাশ গুমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।”