ইরানে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, খাদ্য ঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ
ইরানে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, খাদ্য ঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ইরান। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ পরিবারগুলো তীব্র খাদ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আর ঠিক এমন সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের পুনর্গঠনের ওপর জোর

রবিবার (১০ মে) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে জোর দেন। বলেন, “জনগণকে দেশের পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতাগুলো বাস্তবসম্মতভাবে বুঝতে হবে। এই পথে সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা থাকাটা স্বাভাবিক, তবে জনগণের সহযোগিতা এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর নির্ভর করে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।”

মূল্যস্ফীতির ভয়াবহ চিত্র

ইরানের প্রেসিডেন্টের মন্তব্য এলো এমন একদিনে যার আগের দিন ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র (এসসিআই) বছরের প্রথম ছয় মাসের মূল্যস্ফীতির বিষয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে। এসসিআই বলছে, “ফরভারদিন (ফার্সি ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস) শেষ হয়েছে গত ২০ এপ্রিল। মাসটিতে মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছেছে ৭৩ দশমিক পাঁচ শতাংশে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি।” এসসিআই আরও জানায়, আগের মাসের তুলনায় ফারভারদিনে মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশ বেড়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিন্ন পদ্ধতি ও আলাদা তথ্যভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, এক বছর আগের তুলনায় ফারভারদিনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল কিছুটা কম। মাসটিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭ শতাংশ। একইসঙ্গে মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশ বেড়েছে বলেও জানানো হয়।

যদিও দুটি পরিসংখ্যান পুরোপুরি এক নয়, তবুও উভয় তথ্যই দেখাচ্ছে যে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশগুলোর মধ্যে থাকা ইরানে এই পরিস্থিতি ক্রমাগত মানুষকে আরও দরিদ্র করে তুলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, গত মাসেও যেসব পণ্য তিনি কিনতে পারতেন, এখন তার কিছু আর কেনার সামর্থ্য নেই। ওই নারী বলেন, “এমন অবস্থা যে শুধু আমার তেমনটা নয়। আমার বিশ্বাস, সমাজে আমার মতো অনেকেই কেনাকাটা করতে পারছে না।”

প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে মানুষ তাদের ক্রমশ কমে আসা বেতনের বড় একটি অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।

এসসিআই বলছে, বছরের প্রথম মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়ে ১১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ভেজিটেবল অয়েলের। এই তেলের দাম বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ। দাম বাড়ার তালিকায় এরপরে রয়েছে লিকুইড অয়েল। এই তেলের দাম বেড়েছে ৩০৮ শতাংশ। এছাড়া আমদানি করা চাল ২০৯ শতাংশ, ইরানি চাল ১৭৩ শতাংশ এবং মুরগির মাংসের দাম ১৯১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম দাম বেড়েছে মাখনের, যা ৪৮ শতাংশ। এরপর শিশু খাদ্য ৭১ শতাংশ এবং পাস্তার দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ।

রাজধানী তেহরানের একটি কাবাবের দোকানে কাজ করা তরুণ মাজিদ জানান, গত কয়েক মাসে তাদের দোকানে তিন দফা দাম বাড়াতে হয়েছে। তিনি বলেন, “কলিজার দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সরবরাহকারীদের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা সংকটের কথা বলে। সত্যি বলতে, কোনও কার্যকর তদারকি নেই।”

সরকারের পদক্ষেপ ও বিতর্ক

ইরানের ৩১ গভর্নরের কাছে পাঠানো এক নির্দেশনায় দেশটির রাষ্ট্রীয় ভোক্তা ও উৎপাদক সুরক্ষা সংস্থা জানায়, রান্নায় ব্যবহৃত তেলের মূল্যবৃদ্ধি ‘অবৈধ’ এবং আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে, অবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। এদিকে, দেশটির সংকটাপন্ন মুদ্রা রিয়ালের মানও গত দুই সপ্তাহে নতুন রেকর্ড পরিমাণ পতন দেখেছে। রবিবার বিকালে তেহরানের খোলাবাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার দাঁড়ায় প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার। এক বছর আগে এই হার ছিল আট লাখ ৩০ হাজার রিয়াল।

ভর্তুকি ও ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র’

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ভর্তুকি ও কুপন দেওয়া। পাশাপাশি মজুতদারির মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা, যেগুলোকে মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী মনে করা হচ্ছে।

তবে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখলেও এর সঙ্গে কোনও সুস্পষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা যুক্ত করা হয়নি।

ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে চুক্তির খসড়া প্রস্তাব দিয়েছিল, তার আনুষ্ঠানিক জবাব তেহরান পাঠিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, “আলোচনার কথা বলা মানেই আত্মসমর্পণ নয়।”

ইরান সরকার প্রতি মাসে নগদ ভর্তুকি ও ইলেকট্রনিক ভাউচার বিতরণ করে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যায়। তবে, এই সহায়তার মোট মূল্য জনপ্রতি মাসে ১০ ডলারেরও কম। কর্তৃপক্ষ এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। কিন্তু, তীব্র বাজেট সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আব্দুলনাসের হেম্মাতি জানিয়েছেন, তারা মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে অবগত আছেন। মূল্যবৃদ্ধির জন্য তারা যুদ্ধকে দায়ী করেছেন এবং একইসঙ্গে অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করছেন।

পণ্যের দাম বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো। তাদের দাবি, সামরিক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়া শত্রুরা ‘অর্থনৈতিক প্রতিশোধ’ নেওয়ার অংশ হিসেবে এই মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত এক শোতে একজন অতিথি বলেন, “আমি চাই ইরানের জনগণ যেন শত্রুর তৈরি এই মূল্যবৃদ্ধির ফাঁদে না পড়ে। বড় বড় ঘটনা ইতোমধ্যেই ঘটেছে এবং সামনে আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক অর্জন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অতুলনীয়।”

অর্থনৈতিক দুর্ভোগের একটি বড় অংশ এখনও তৈরি হচ্ছে ইরানি কর্তৃপক্ষের আরোপ করা প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধের কারণে, যা টানা ৭২তম দিনে গড়িয়েছে। সরকার, ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি এবং অন্যান্য রাষ্ট্র সম্পৃক্ত সংস্থার বহু কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, তারা বর্তমানে চালু হওয়া স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার বিরোধী। তবে তারা দাবি করেছেন, এ বিষয়ে তাদের কোনও দায় নেই, কারণ যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকার কথা থাকা।