আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে লেবাননে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যুদ্ধ জয়ের চেয়েও কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরান, হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইলের কাছে চলমান যুদ্ধটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে লেবানন সরকারের কাছে হিজবুল্লাহ একই সঙ্গে স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে দর কষাকষির একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধটি তাদের বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও কেবল একটি সামরিক অভিযান হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়।
রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধান নেই
প্রথমত, এটি স্পষ্ট যে রাজনৈতিক সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান নেই এবং শক্তির ব্যবহার পরিস্থিতিকে কেবল আরও জটিল করে তোলে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের আগে হিজবুল্লাহর কোনো অস্তিত্ব ছিল না এবং ১৯৬৭ সালের দখলের আগে হামাসেরও উদ্ভব হয়নি। কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে দমন বা নিশ্চিহ্ন করার প্রতিটি প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত এই ধরনের সশস্ত্র আন্দোলনের জন্ম দেয়।
সংঘাত টিকিয়ে রাখার স্বার্থ
দ্বিতীয়ত, বর্তমান সংঘাত টিকিয়ে রাখার পেছনে কিছু শক্তিশালী মহলের স্বার্থ কাজ করছে। লেবাননের ভেতরে কিছু রাজনৈতিক পক্ষ ইসরাইলের সাথে হাত মেলাচ্ছে, যা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার পথ প্রশস্ত করছে। অন্যদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে আগ্রহী। অভ্যন্তরীণ জনমতকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তিনি উত্তেজনা জিইয়ে রাখছেন।
লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কারণ
তৃতীয়ত, ইরান বা লেবাননের মতো দেশগুলো কেন বারবার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, তা নিয়ে ভিন্নধর্মী একটি ধারণা উঠে আসছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান পরমাণু অস্ত্রধারী নয় বলেই দেশটি আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। একই কথা লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; যতক্ষণ পর্যন্ত একটি দেশকে সামরিকভাবে সহজে পরাজিত করার মতো দুর্বল ভাবা হবে, ততক্ষণ সেখানে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যাবে।
সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা
পরিশেষে, বর্তমান পরিস্থিতি ইসরাইলের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সেই সব দেশের ক্ষয়িষ্ণু প্রভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে যারা নিরাপত্তার জন্য পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তার দায়িত্ব বাইরের কোনো শক্তির হাতে তুলে দেওয়া কখনোই টেকসই সমাধান হতে পারে না। এর ফলে বড়জোর একটি জোরপূর্বক 'সশস্ত্র স্থিতিশীলতা' তৈরি হতে পারে, কিন্তু লেবানন বা বৃহত্তর অঞ্চলে প্রকৃত ও স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।



