যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের শান্তি আলোচনার পরিকল্পনা আপাতত ভেস্তে গেছে। দুই দেশই এখন এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছে, যেখানে শান্তিও অর্জিত হয়নি, আবার সরাসরি যুদ্ধও নেই। এই অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং উভয় দেশই একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আত্মবিশ্বাসী যে তারা যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক যন্ত্রণা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সময় ধরে সহ্য করতে পারবে। কিন্তু একই সঙ্গে তেহরান শঙ্কিত যে, আলোচনার গতি হারিয়ে ফেলায় তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি আক্রমণের স্থায়ী হুমকির মধ্যে আটকা পড়ে যেতে পারে।
গত বছর জুন মাসে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং ইরানের পূর্ববর্তী সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাসান কারিমি বলেন, ‘যা ঘটছে তা অনেকটা ১২ দিনের যুদ্ধের শেষের মতোই। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু কোনও স্থায়ী রূপ পায়নি।’
ট্রাম্পের অবস্থান
শনিবার ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারকে দ্বিতীয় দফার যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। ট্রাম্পের মতে, ইরানিরা আলোচকদের সময় নষ্ট করবে।
রবিবার ট্রাম্প বলেছেন, ইরান যদি যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা করতে চায়, তাহলে তারা ফোন করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘তারা (ইরান) যদি কথা বলতে চায়, তারা আমাদের কাছে আসতে পারে, অথবা ফোন করতে পারে। আপনারা জানেন, ফোন বলে একটা জিনিস আছে। আমাদের নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা জানে চুক্তিতে কী থাকতে হবে। বিষয়টা খুবই সহজ: তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না, নইলে বৈঠকের কোনও অর্থ নেই।’
অচলাবস্থার কারণ
ইরানের প্রভাবশালী রক্ষণশীল পত্রিকা খোরাসান সম্প্রতি একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধটি দেশটির অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘কৌশলগত দোলাচল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, এর ঝুঁকি অনেক বেশি। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, “উভয় পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধের ক্ষতি থেকে সরে এসেছে, কিন্তু শক্তি ও চাপের যুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এটি হয়তো স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।”
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলা একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়। এরপর থেকেই দুই পক্ষই নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে দাবি করছে। হরমুজ প্রণালিতে সমান্তরাল অবরোধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্র সহ্য করতে পারবে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃঢ় বিশ্বাস। এর ফলে শান্তি আলোচনার পথে বাধা সৃষ্টি হয়েছে এবং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ।
তবে ইরানের সাবেক কর্মকর্তা কারিমি বর্তমান নেতৃত্বকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে এখন সবচেয়ে রক্ষণশীল আচরণ হলো বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখা। কারণ কোনও ধরনের পরিবর্তন আগামীতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে তার দায় নিতে হবে।’ তিনি বর্তমান মুহূর্তটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তির পুরো কাঠামো, অর্থাৎ ইরানের ছাড় দেওয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত দাবি এবং আঞ্চলিক শান্তি চুক্তির রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা সরাসরি আলোচনায় বসবেন না। তবে এ অচলাবস্থার মধ্যেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুক্রবার পাকিস্তানে সফরের পর শনিবার তিনি ওমানে বৈঠক করেছেন এবং রবিবার পুনরায় পাকিস্তানে ফিরেছেন। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার বৈঠকের পর তিনি রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। ইসলামাবাদের বাইরে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করাটাকেও তেহরান গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, কারণ ওমানও হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রকে তিন ধাপের একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। রবিবার ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তেহরানের শর্তগুলো জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এবং ইরান ও লেবাননের ওপর নতুন করে হামলা বন্ধে নিশ্চয়তা প্রদান। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হওয়ার পরেই আলোচনা দ্বিতীয় পর্যায়ে যাবে, যা হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার ওপর আলোকপাত করবে। তৃতীয় পর্যায়ে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হবে। যদিও তেহরান জোর দিয়ে বলেছে যে পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোতে অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তারা পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নেবে না।
ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, আরাঘচি ওয়াশিংটনকে লিখিত বার্তাও দিয়েছেন, যেখানে তেহরানের অলঙ্ঘনীয় সীমা তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির বিষয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বার্তাটির উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করা, কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়।
ঝুঁকিতে কারা?
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন-এর প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাতমঙ্গলিচ মনে করেন, ইরান এখনও বিশ্বাস করে যে তারা অর্থনৈতিকভাবে ট্রাম্পকে টেক্কা দিতে পারবে। তিনি বলেন, ‘ইরান অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য ট্রাম্পকে অপেক্ষা করাতে পারবে। আসলে হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা ইরানিদের চেয়ে ট্রাম্পের জন্য বেশি ব্যয়বহুল।’
তবে ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যে মারাত্মক সংকটে রয়েছে। দেশজুড়ে ছাঁটাইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং যুদ্ধের কারণে পেট্রোকেমিক্যাল ও ওষুধের উৎপাদন সংকটে পড়েছে। ইরানের শীর্ষ অর্থনৈতিক পত্রিকা দুনিয়া-এ-ইকতেসাদ পূর্বাভাস দিয়েছে যে, চুক্তিতে পৌঁছানোর সবচেয়ে আশাবাদী ক্ষেত্রেও বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পত্রিকাটির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ অবস্থা আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতিকে ৭০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। আর যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে হাইপারইনফ্লেশনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
কয়েকজন অর্থনীতিবিদের ধারণা, ইরানের শাসকগোষ্ঠী বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট আরও তিন থেকে ছয় মাস সামলে নিতে পারবে। অন্যদিকে বাতমঙ্গলিচের মতে, তেলের উৎপাদন ও সার রফতানিতে বিঘ্নের ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর ধাক্কা লাগতে পারে, যা ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে বাধ্য করতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত ইরান অর্থনৈতিকভাবে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারলেও তাদের কৌশলগত সংকট থেকেই যাবে বলে মনে করছেন বাতমঙ্গলিচ। তিনি বলেন, “ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ‘চুক্তিহীন, যুদ্ধহীন’ অবস্থা তাদের অরক্ষিত অবস্থায় রেখেছে।”



