রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা সামান্য বেশি হলে তা অবিলম্বে আতঙ্কের কারণ নয়, তবে সম্পূর্ণ অবহেলাও করা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শরীরে বড় কোনো রোগের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। ভারতের নয়ডার ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ডা. আশিশ কুমার গোভিল বলেন, ‘কোলেস্টেরলের মাত্রা সামান্য বাড়লে কেবল জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন, যেমন—ভালো খাবার খাওয়া এবং কায়িক পরিশ্রম বাড়ানোর মাধ্যমেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এটি পুরোপুরি ক্ষতিকর নয়, এমন ভাবা ভুল হবে।’
ভালো কোলেস্টেরল বনাম মন্দ কোলেস্টেরল
কোলেস্টেরল শরীরের প্রতিটি কোষে থাকা মোমের মতো চর্বিযুক্ত উপাদান, যা হরমোন, ভিটামিন ডি এবং খাবার হজমে সহায়তা করে। রক্তে মূলত দুই ধরনের লাইপোপ্রোটিন কোলেস্টেরল বহন করে: এলডিএল (মন্দ কোলেস্টেরল) এবং এইচডিএল (ভালো কোলেস্টেরল)। এলডিএলের মাত্রা বেড়ে গেলে ধমনীতে চর্বি জমে শক্ত হয়ে যায়, যা রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, এইচডিএল রক্ত থেকে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল দূর করতে সাহায্য করে; এর মাত্রা কমে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় মাথায় রাখা জরুরি
কোলেস্টেরল সামান্য বেশির পাশাপাশি যদি কোনো ব্যক্তির ধূমপানের অভ্যাস, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকে, তবে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। এই অতিরিক্ত ঝুঁকিগুলো থাকলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই অত্যন্ত সচেতন হতে হবে।
ওষুধ বা স্ট্যাটিন কখন প্রয়োজন?
চিকিৎসকদের মতে, কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরও যদি কোলেস্টেরলের মাত্রা না কমে বা রোগীর সামগ্রিকভাবে হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি থাকে, তখন ওষুধের প্রয়োজন হয়। ডা. গোভিল বলেন, ‘চিকিৎসকরা রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করেন—যেমন তিনি ধূমপায়ী কিনা, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে কিনা। এসব অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকলে হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে চিকিৎসকরা সাধারণত ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন।’
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ৭টি কার্যকরী উপায়
সামান্য বেশি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকরা সাধারণত জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। নিচে প্রধান কিছু উপায় তুলে ধরা হলো:
- হৃদবান্ধব ডায়েট: খাবারে ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট পরিহার করতে হবে। রান্নায় অলিভ অয়েল বা ক্যানোলা অয়েল ব্যবহার করা এবং প্রতিদিন এক মুঠো আখরোট বা কাঠবাদাম খাওয়া উপকারী।
- দ্রবণীয় ফাইবার গ্রহণ: দ্রবণীয় ফাইবার পাচনতন্ত্রে কোলেস্টেরলকে আটকে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এজন্য ডাল, ছোলা, কালো বিন এবং তাজা ফলমূল বেশি খেতে হবে।
- শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের অ্যারোবিক ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করা উচিত। এটি ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে ও মন্দ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজনের সামান্য কিছু অংশ কমালেও তা এলডিএল বা মন্দ কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
- ধূমপান বর্জন: ধূমপান ত্যাগ করলে শরীরে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা দ্রুত উন্নত হয় এবং হৃদযন্ত্র ভালো থাকে।
- অ্যালকোহল পরিহার: অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানের অভ্যাস কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোলেস্টেরলের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
পরিশেষে, কোলেস্টেরল সামান্য বেশি থাকলে প্রাথমিকভাবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় পরীক্ষা করা উচিত। সঠিক সময়ে সচেতন হলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সহজেই এড়ানো সম্ভব। সূত্র: এনডিটিভি।



