বিশ্ব স্বাস্থ্যদিবসে গোলটেবিল বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা
বিশ্ব স্বাস্থ্যদিবস উপলক্ষে প্রথম আলো, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের উদ্যোগে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মিনি কনফারেন্স হলে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক রোগের ঝুঁকি, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্যদিবস সামনে রেখে এই গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়, যার এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’।
জলবায়ু পরিবর্তন ও সংক্রামক রোগের বাড়তি ঝুঁকি
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা উল্লেখ করেন যে জলবায়ু পরিবর্তন চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যার ফলে প্রতি বছর নিত্যনতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির মূল কারণ। তিনি কার্যকর টিকাদান ও নজরদারি ব্যবস্থাকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। বাংলাদেশ জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম, ডিপথেরিয়া ও পলিও নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পেলেও নতুন উদীয়মান রোগ প্রতিরোধে শক্তিশালী নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত পদ্ধতির গুরুত্ব
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন যে আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক ওষুধ এবং বৈজ্ঞানিক প্রটোকল নিশ্চিত করলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবারের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে ‘ওয়ান হেলথ সিস্টেম’-এর গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা মানুষের স্বাস্থ্য, পশুপাখি ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একত্রে রক্ষার একটি সমন্বিত পদ্ধতি। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এই তিন ক্ষেত্রের স্বাস্থ্য সঠিকভাবে রক্ষা না করা যায়, সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় গবেষণা ও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা
চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওমর ফারুক ইউসুফ উন্নত দেশে স্বাস্থ্য গবেষণায় জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ খরচ করা হয় উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য গবেষণায় বেশি বিনিয়োগ করা দরকার। তিনি যোগ করেন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি সেবা না দিলেও শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যতের চিকিৎসক তৈরি করছে, তাই শিক্ষাতেও বিনিয়োগ জরুরি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সমন্বিত হলে তার কার্যকারিতা বাড়ে, কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসক, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, জনস্বাস্থ্যবিদ, এআই–বিশেষজ্ঞ ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারের সমন্বয়ে গঠিত অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি।
রেফারেল চিকিৎসা ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ একরাম হোসেন রেফারেল চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ধাপে ধাপে চিকিৎসাসেবা বোঝায়। তিনি টেলিমেডিসিন সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রোগীর চাপ কমানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সহকারী অধ্যাপক তুহিন বিশ্বাস স্বাস্থ্য নীতি ও পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য, ধারাবাহিক ও মানসম্মত তথ্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন, পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্য ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মত দেন।
হাসপাতালের চাপ ও সমাধানের উপায়
গোলটেবিলে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় ১১টি সদর হাসপাতাল, ১০২ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ২ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও মানুষ সরাসরি নগরকেন্দ্রিক হাসপাতালে আসে, যার ফলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাপ বেড়ে যায়। চমেক হাসপাতালের শয্যাক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকে বলে উল্লেখ করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আবদুর রব অনুষদ উন্নয়নের মাধ্যমে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি বলে মত দেন এবং চট্টগ্রাম শহর ও পটিয়া অথবা সীতাকুণ্ডে দুটি সার্ভিস হাসপাতাল তৈরি করলে চমেকে তিন থেকে চার হাজার রোগীর চাপ কমবে বলে উল্লেখ করেন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- চমেক হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও সমন্বিত টিম গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
- হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিঞা শিশুদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে টিকাদান, পুষ্টি ও এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং-এর গুরুত্ব উল্লেখ করেন।
- হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, নিয়মিত স্ক্রিনিং ও জীবনধারার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।
- চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন মানব স্বাস্থ্য, জেনেটিক ও পরিবেশগত রোগের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার গুরুত্ব এবং অ্যান্টি–মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ঠেকাতে ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
- চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হোসনা আরা বেগম রোগীর আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব উল্লেখ করেন।
গোলটেবিল বৈঠকে বৈজ্ঞানিক সহযোগী হিসেবে এরিস্টোফার্মা লিমিটেড অংশগ্রহণ করে, যার বিক্রয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রবিউল হোসেন মানসম্মত ওষুধ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ও নকল ওষুধ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।



