মাছের আড়তে হিসাবরক্ষকের কাজে ব্যস্ত মরণ দাস। তাঁর ছেলে অভিষেক দাস চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। সেখানে ছেলেকে রেখেই জীবিকার তাগিদে কর্মস্থলে ফিরেছেন তিনি। রাতে ছেলের পাশে থাকেন, দিনের বেলা কাজ করেন।
সংসারের হাল ও কাজ
মরণ দাস মিরসরাই উপজেলার হাইতকান্দি ইউনিয়নের বালিয়াদি এলাকার বাসিন্দা। দেড় বছর আগে বিয়ে করেন তিনি। সাত মাস আগে জন্ম নেওয়া ছেলে অভিষেক জন্মের পর থেকেই কিডনি রোগসহ নানা জটিলতায় ভুগছিল। কিডনির চিকিৎসা করাতে গিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম শনাক্ত হয় তাঁর। অবস্থা গুরুতর হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
মরণ দাসের দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন মা, স্ত্রী, সন্তান ও ছোট ভাই মিলে পাঁচজনের সংসার তাঁর। বছর দুয়েক আগে বাবা মারা যাওয়ায় পুরো সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজারে একটি ছোট মাছের আড়তে হিসাবরক্ষকের কাজ করেন তিনি। ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত কাজ করে দৈনিক ৫০০ টাকা পান। এই টাকায় চলে তাঁর সংসার।
ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রথম কয়েক দিন কাজে আসেননি মরণ দাস। কিন্তু আর্থিক সংকটে পড়ে এখন প্রতিদিন এক বেলা কাজ করতে আসেন।
কর্মস্থলে ব্যস্ততা ও চিন্তা
গতকাল রোববার সকাল আটটায় বড়তাকিয়া বাজার মৎস্য আড়তে দেখা যায়, বিসমিল্লাহ মৎস্য আড়তে বসে মাছ বেচাবিক্রির হিসাব লিখছেন তিনি। কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাঁর চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ।
মরণ দাস বলেন, 'চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি আমার ছেলেকে দেখাশোনার জন্য স্ত্রী বৃষ্টি রানী দাস, মা অর্চনা রানী দাস ও ছোট ভাই টিটু দাস রয়েছে। আমি সারা দিন হাসপাতালে ছোটাছুটি করে রাত দুইটায় চট্টগ্রাম শহর থেকে মিরসরাইয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দিই। রাত সাড়ে তিনটা-চারটার দিকে পৌঁছে আড়তে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ভোর পাঁচটা থেকে মাছ বিক্রির কাজ শুরু করি। হিসাবপত্র শেষ করে আবার সকাল ১০টায় শহরের বাস ধরে হাসপাতালে পৌঁছাই। আর্থিক সংকটের এই সময়ে রোজগারের সামান্য টাকাটুকু বড় কাজে আসে। সন্তানকে আইসিইউতে রেখে কাজে আসতে মন চায় না। বাধ্য হয়ে কাজে আসলেও মনটা আমার ছেলের কাছেই পড়ে থাকে।'
সহায়তা ও চিকিৎসা
বিসমিল্লাহ মৎস্য আড়তের অংশীদার শিপ্লব দাস বলেন, 'আইসিইউতে থাকা হামে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে কঠিন সময় পার করছেন মরণ দাস। আর্থিক অনটনের কারণে এমন অবস্থায়ও চট্টগ্রাম শহর থেকে আড়তে এসে এক বেলা কাজ করে যান তিনি। আমরা অংশীদার হিসেবে তাঁকে সাধ্যমতো সাহায্য করি।'
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ মুসা বলেন, 'অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হামে আক্রান্ত শিশু অভিষেক দাসকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশুটিকে আমি দেখে এসেছি। হামের পাশাপাশি কিডনির রোগসহ নানা জটিলতা আছে তার। শিশুটির চিকিৎসা চলছে। আমরা ভালো কিছুই আশা করছি।'
হামের পরিস্থিতি
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত ২৯ এপ্রিল থেকে রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪৭ জন ভর্তি ছিল। এর মধ্যে ২৪৪ জনই ভর্তি নগরের হাসপাতালগুলোতে। জেলায় এ পর্যন্ত ১১৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামে নিশ্চিত মৃত্যু একজনের। সন্দেহজনক হামের রোগী ১ হাজার ২২২, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৯৭৫ জন। ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৭৪ জন।



