সম্পাদকীয়: বৈষম্যমূলক উন্নয়ননীতির কারণে গ্রাম-মফস্বল থেকে নগরমুখী জনস্রোত ও চূড়ান্ত অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলাফল হচ্ছে বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বে তলানিতে থাকা নগর ঢাকা। জনঘনত্ব, দূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মানসিক স্বাস্থ্য—সব বিবেচনায় এই নগরে নাগরিকদের বাধ্য হয়েই বাস করতে হয়।
মন্ত্রীর মন্তব্য নাগরিকদের ক্ষোভের প্রতিধ্বনি
আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘ঢাকাকে বাসযোগ্য মনে হয় না’ বলে যে মন্তব্য করেছেন, সেটি উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত নির্বিশেষে সব শ্রেণির নগরবাসীর ক্ষোভ ও যন্ত্রণারই প্রতিধ্বনি। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, শনিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত সেমিনারে জলাবদ্ধতা, মশকনিধন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, নগর-পরিকল্পনা ও নাগরিক অংশগ্রহণ—এসব বিষয়ে করণীয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন ইতিবাচক
নাগরিক, বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা যাতে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন, সে জন্য দক্ষিণ সিটির উদ্যোগে একটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধনও করা হয়েছে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের ডেকে আলোচনা করা এবং নাগরিকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে ঢাকা নগরের প্রধান সমস্যাগুলো কী, তা সমাধানে করণীয় কী, এ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে সমন্বিত এমন কোনো পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যেটা নাগরিকদের কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করতে পারে। বরং আজ ডেঙ্গু, কাল জলাবদ্ধতা, পরশু হাম, তরশু স্কুলের ওপর বিমান ভেঙে পড়া—একের পর এক দুর্যোগ, দুর্বিপাকে সংকট হানা দেয় নাগরিকদের ঘরে।
নদী পুনরুদ্ধার জরুরি
বাস্তবতা হলো, ঢাকা এখন যে সমস্যা ও সংকটের ভারে জর্জরিত, সেখানে সমস্যার ভারকেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা খুবই জরুরি। সেমিনারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদকে প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সেটা অগ্রাধিকারে থাকা উচিত। কেননা ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকায় যে নগরায়ণ হয়েছে, সেটি মূলত নদীকেন্দ্রিক। ঢাকায় বায়ুদূষণ ও পানির যে ভয়াবহ সংকট, নদীগুলোর প্রাণ ফেরানো গেলে তার অনেকখানি সমাধান করা সম্ভব। তবে দখল ও দূষণ থেকে নদীকে বাঁচাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সাহসী রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
দুটি বড় পরীক্ষা: জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গু
আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকার ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সামনে খুব বড় দুটি পরীক্ষা রয়েছে। প্রথমটি হলো আসন্ন বর্ষা মৌসুমের জলাবদ্ধতা, দ্বিতীয়টি হলো মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা। বিগত সরকারগুলোর আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও ঢাকায় কোনো কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। ফলে মাঝারি মাপের বৃষ্টি হলেই ঢাকার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতায় নাগরিক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। তবে বর্ষা মৌসুমের আগে ঠিকঠাক প্রস্তুতি নিলে এবং পয়োনিষ্কাশনের নালা ও খালগুলো পরিষ্কার করলে পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ মানবিক বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেঙ্গুর নিয়ন্ত্রণকে শুধু মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে পরিণত করার কারণে বারবার একই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। এডিস মশার ঘনত্বের কারণে এ বছরও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের অনেক বড় ঝুঁকি রয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার ও সিটি করপোরেশন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ মেনে বিজ্ঞানসম্মতভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
কাজের বিকল্প নেই
আমরা মনে করি, ঢাকাকে মোটামুটি বাসযোগ্য করে তুলতে হলে সরকারকে কথার চেয়ে কাজের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কার্ল মার্ক্সের এই ধ্রুপদি উক্তির ‘দার্শনিকেরা এত দিন জগৎকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো একে পাল্টানো’—মর্মবাণী আমাদের নীতিনির্ধারকেরা যত দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবেন, নাগরিকদের জন্য ততই সেটা মঙ্গল।



