গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছেন। অনেকেই গরমের শুরুতে কিছু শারীরিক সমস্যাকে 'সাধারণ ক্লান্তি' বা 'রোদের কারণে দুর্বলতা' ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবহেলাই মারাত্মক 'হিট স্ট্রোক' ডেকে আনতে পারে। সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনে ব্যবস্থা না নিলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এটি জীবনঘাতী হতে পারে।
হিট স্ট্রোক কী এবং কেন হয়?
অনেকের ধারণা, শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরাসরি রোদে থাকলেই হিট স্ট্রোক হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বদ্ধ বা অতিরিক্ত গরম ঘর, অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে ঘরের ভেতরে বা ছায়ায় বসেও হিট স্ট্রোক হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হিট স্ট্রোক তীব্র গরমজনিত একটি গুরুতর অবস্থা, যাতে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও পেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও হতে পারে।
যখন প্রচণ্ড গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে চলে যায়, তখন তাকে হিট স্ট্রোক বলে। সাধারণত ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা থাকে, কিন্তু অতিরিক্ত তাপ বা পানিশূন্যতায় এই কুলিং সিস্টেম কাজ করা বন্ধ করে দিলে শরীর বিপজ্জনকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ
হিট স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব সাধারণ মনে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে:
- তীব্র মাথা ঘোরানো বা মাথা হালকা লাগা
- প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা বা অবসাদ
- তীব্র মাথাব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
- শরীর অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া
- শুরুতে অতিরিক্ত ঘাম এবং পরে হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া
- হৃদস্পন্দন বা পালস রেট অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া
- মাংসপেশিতে তীব্র টান বা ব্যথা (মাসল ক্র্যাম্প)
মানসিক বিভ্রান্তি: বড় বিপদের সংকেত
হিট স্ট্রোকের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে তা সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত করে। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন আসা সবচেয়ে বড় বিপদের লক্ষণ। যেমন:
- তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশন
- যেকোনো কথার উত্তর দিতে দেরি হওয়া বা ধীর প্রতিক্রিয়া
- কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অস্পষ্ট হওয়া
- চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা হারিয়ে ফেলা
- মাত্রাতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ, ছটফটানি বা অস্বাভাবিক আচরণ
প্রায়ই আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বোঝার আগেই পরিবারের সদস্যরা এই আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। খিঁচুনি বা জ্ঞান হারানো হিট স্ট্রোকের চূড়ান্ত জরুরি অবস্থা।
ঝুঁকিতে যারা
গ্রীষ্মের দাবদাহে কিছু মানুষের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে বেশি:
- শিশু এবং প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তি
- তীব্র রোদে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ ও ক্রীড়াবিদ
- যারা দীর্ঘক্ষণ কম পানি পান করেন
- ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা কিডনির মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
- অতিরিক্ত স্থূলতা বা চলাফেরায় অক্ষম মানুষ
তাৎক্ষণিক করণীয়: আপনার পদক্ষেপ বাঁচাতে পারে প্রাণ
কারো মধ্যে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে নিচের পদক্ষেপ নিন:
- ঠান্ডা স্থানে সরিয়ে নিন: রোগীকে দ্রুত রোদ থেকে সরিয়ে এসি রুমে বা ফ্যানের নিচে ছায়াযুক্ত ঠান্ডা স্থানে নিয়ে আসুন।
- কাপড় হালকা করুন: শরীরের অতিরিক্ত, ভারী বা টাইট জামাকাপড় খুলে দিন বা ঢিলেঢালা করে দিন।
- শরীর ঠান্ডা করুন: রোগীর পুরো শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটান বা ভেজা তোয়ালে দিয়ে বারবার মুছে দিন।
- আইস প্যাকের ব্যবহার: রোগীর ঘাড়, বগল, মাথা এবং কুঁচকিতে বরফ বা আইস প্যাক দিন। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে আসে।
- পানি পান: রোগী যদি সজ্ঞানে ও সতর্ক থাকেন, তবেই তাকে অল্প অল্প করে পানি বা স্যালাইন খেতে দিন। অজ্ঞান অবস্থায় মুখে কিছু দেওয়া যাবে না।
- জরুরি সেবা: প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়
চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতাই হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায়:
- তৃষ্ণা না পেলেও সারাদিন প্রচুর পানি ও তরল খাবার (ডাবের পানি, লেবুর শরবত) পান করুন।
- দুপুরের চড়া রোদ (বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টা) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
- বাইরে বের হলে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরুন এবং ছাতা, টুপি বা রোদচশমা ব্যবহার করুন।
- রোদে কাজের মাঝে মাঝে ছায়ায় গিয়ে বিশ্রাম নিন।
- চা, কফি বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় কম খান, কারণ এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে।
হিট স্ট্রোক শুধু সাধারণ ক্লান্তি নয়; এটি একটি নীরব ঘাতক। তাই শরীরে কোনো অস্বস্তি দেখা দিলে তা চেপে না রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিন এবং সুস্থ থাকুন।



