সন্তান জন্মদানের পর শরীরকে পুনরায় গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হতে সময় লাগে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি সন্তানের মধ্যে অন্তত ১৮ থেকে ২৪ মাসের বিরতি রাখা উচিত। এর চেয়ে কম বিরতি মা ও শিশু উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। এমনকি গর্ভপাতের পরও পরবর্তী গর্ভধারণের আগে অন্তত ৬ মাস অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রসবের কতদিন পর গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে?
অনেক মা মনে করেন ডেলিভারির কয়েক মাস বা সপ্তাহের মধ্যে গর্ভধারণের ঝুঁকি কম থাকে। তবে এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কেউ কেউ ভাবেন প্রসবের পর পিরিয়ড শুরু না হলে পুনরায় গর্ভধারণ হয় না, কিন্তু গর্ভধারণের জন্য পিরিয়ড ফিরে আসা জরুরি নয়। শরীর সাধারণত পিরিয়ড শুরুর দুই সপ্তাহ আগেই ডিম্বাণু নিঃসরণ করে (ওভুলেশন)। তাই পিরিয়ড শুরুর আগেও গর্ভধারণ সম্ভব।
যদি আপনি সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ান বা ফর্মুলা খাওয়ান, তবে ডেলিভারির এক মাসের মধ্যেই ওভুলেশন হতে পারে এবং ৬ সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় গর্ভধারণ সম্ভব। তাই অপরিকল্পিত গর্ভধারণ এড়াতে প্রসব-পরবর্তী সহবাসের শুরু থেকেই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
বুকের দুধ খাওয়ানো ও গর্ভধারণের সম্পর্ক
অনেক মা মনে করেন বুকের দুধ খাওয়ালে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই, কিন্তু এটি সঠিক নয়। বুকের দুধ খাওয়ালে ওভুলেশন কিছুটা দেরি হলেও এটি সম্পূর্ণ কার্যকর নয়। নিচের তিনটি শর্তে বুকের দুধ খাওয়ালে পুনরায় গর্ভধারণের ঝুঁকি কম থাকে:
- যদি পিরিয়ড পুনরায় শুরু না হয়
- যদি শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো হয় (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং), অর্থাৎ ফর্মুলা বা অন্য কোনো খাবার না দেওয়া হয়
- যদি শিশুর বয়স ৬ মাসের কম হয়
তবুও অপরিকল্পিত গর্ভধারণ এড়াতে বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি একটি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা নিরাপদ।
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে পরিকল্পনা
প্রসবের পর সহবাস শুরুর আগেই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে পরিকল্পনা করে নিন। এমনকি গর্ভাবস্থায়ও এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন। অধিকাংশ মা গর্ভাবস্থার শেষে বা প্রসবের পরপরই এটি নিয়ে আলোচনা করেন। হাসপাতালে ডেলিভারি হলে বের হওয়ার আগেই চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করুন। ডেলিভারির পরবর্তী চেকআপে (সাধারণত ৬-৮ সপ্তাহ পর) চিকিৎসক এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন। তবে আপনি যেকোনো সময় আলোচনা করতে পারেন।
আলোচনার সময় নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
- পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা
- ভবিষ্যৎ পরিবার পরিকল্পনা
- আপনার ও সঙ্গীর পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- কোনো শারীরিক সমস্যা বা রোগ থাকলে
কখন শুরু করবেন
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শুরু করার সময় নির্ভর করে পদ্ধতি, আপনার স্বাচ্ছন্দ্য, দৈনন্দিন জীবন ও শারীরিক অবস্থার উপর। দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি সন্তান জন্মের পরপরই ব্যবহার করা যায়। কিছু পদ্ধতি, যেমন কম্বাইন্ড জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ব্যবহারের জন্য অন্তত ৬ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।
প্রচলিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
ডেলিভারির পর বিভিন্ন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়:
- ব্যারিয়ার মেথড: পুরুষ ও মহিলা কনডম, স্পার্মিসাইড, ডায়াফ্রাম, সারভাইকাল ক্যাপ, স্পঞ্জ
- জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি: মিশ্র বড়ি (সুখী), প্রজেস্টোরন বড়ি বা মিনিপিল (আপন)
- ইন্ট্রা ইউটেরাইন ডিভাইস (আইইউডি): হরমোন বা কপারের তৈরি
- ইমপ্ল্যান্ট
- ইনজেকশন: ডিপো, প্রোভেরা
- স্থায়ী পদ্ধতি: পুরুষদের ভ্যাসেকটমি, নারীদের টিউবাল লাইগেশন
- প্রাকৃতিক পদ্ধতি: ল্যাকটেশনাল এমেনোরিয়া
প্রত্যেকটি পদ্ধতির কার্যকারিতা ও ব্যবহারবিধি আলাদা।
জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ
সন্তান জন্মের পর জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হলে নিচের পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়:
- ইমারজেন্সি পিল: লেভোনোগ্যাস্ট্রল (এলএনজি-ইসিপি) বা 'মর্নিং আফটার' পিল। আরেকটি হলো ইউলিপ্রোস্টাল এসিটেট (ইউপিএ) পিল। বুকের দুধ খাওয়ালে এ পিল এড়িয়ে চলুন।
- কপার আইইউডি: অনিয়ন্ত্রিত সহবাসের ৫ দিনের মধ্যে ব্যবহার করলে ভবিষ্যতেও সুরক্ষা দেয়।
পদ্ধতি বাছাইয়ের আগে বিবেচ্য বিষয়
- সন্তান: আপনি আর সন্তান চান কি না, চাইলে কতদিন পর। না চাইলে স্থায়ী পদ্ধতি বেছে নিন।
- সময়: কিছু পদ্ধতি প্রসবের পরপরই শুরু করতে হয়, কিছুতে অপেক্ষা করতে হয়।
- বুকের দুধ খাওয়ানো: সব পদ্ধতি নিরাপদ নয়; কিছু দুধের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
- কার্যকারিতা: আগে ব্যবহার করা পদ্ধতি এখন কার্যকর নাও হতে পারে (যেমন স্পঞ্জ, ক্যাপ)।
- পুনরাবৃত্তি: দৈনিক, মাসিক বা বার্ষিক ব্যবহারের পদ্ধতি বেছে নিন।
- যৌনবাহিত রোগ: কনডম যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি কমায়।
- অন্যান্য রোগ: উচ্চ রক্তচাপের মতো অবস্থায় কিছু পদ্ধতি এড়িয়ে চলুন।
- ওভার দা কাউন্টার: কনডম, স্পার্মিসাইড, স্পঞ্জ নিজে ব্যবহার করা যায়; অন্যদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের সময় নিচের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- এক বা উভয় পা ফুলে গেলে
- শ্বাসকষ্ট হলে
- বুকে ব্যথা হলে
- পায়ে স্পর্শ করলে ব্যথা হলে
এছাড়া কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।



