হামের উপসর্গে বরিশাল মেডিকেলে রোগীর চাপ, বেড সংকটে চিকিৎসা মেঝেতে
হামের উপসর্গে বরিশাল মেডিকেলে রোগীর চাপ, বেড সংকট

তড়িঘড়ি করে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অটোরিকশা থেকে শিশুকে কোলে নিয়ে নামছিলেন এক ব্যক্তি। সঙ্গে ছিলেন এক বৃদ্ধা নারী। শিশুটিকে নিয়ে দ্রুত জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষে যাওয়ার আগেই তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—টিকিট কেটেছেন কিনা। তখন তিনি জানান, তার কাছে কোনও টিকিট নেই। পরে হাসপাতালের কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে আবার লাইনে দাঁড়ান তিনি।

ভর্তি প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা

ভর্তির কাগজ থেকে জানা যায়, ৯ বছরের শিশু সুমাইয়াকে নিয়ে এসেছেন তার বাবা নুরুজ্জামান মৃধা। সঙ্গে রয়েছেন সুমাইয়ার দাদি রওশন আরা। তাদের বাড়ি পটুয়াখালীর খাসেরার গ্রামে। কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক শিশুটিকে দেখে হামের উপসর্গ রয়েছে বলে ধারণা করেন। পরে তাকে হাসপাতালের নিচতলার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হয়, যেটি বর্তমানে হাম ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওয়ার্ডে নেওয়ার পর নার্সরা সুমাইয়ার তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। বেড না থাকায় শুরুতে তাকে ফ্লোরেই রাখা হয়। পরে শিশু বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কিছু টেস্ট দেন এবং রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা শুরু হবে বলে জানান।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পারিবারিক সংকট ও উদ্বেগ

মেয়েকে নিয়ে উদ্বিগ্ন নুরুজ্জামান বারবার চিকিৎসকদের জিজ্ঞেস করছিলেন, “খারাপ কিছু হয়নি তো?” জবাবে চিকিৎসকরা জানান, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, চিকিৎসা দিলে সুস্থ হয়ে যাবে। নুরুজ্জামান জানান, জ্বরের কারণে তার মেয়ে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রথমে পটুয়াখালী হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি বলেন, “আগে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। এখন চাকরি নেই। মেয়ের চিকিৎসার জন্য স্ত্রীর কানের দুল বিক্রি করে এখানে এনেছি। আশা করছি মেয়েটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে।” চার দিন পর গিয়ে দেখা যায়, সুমাইয়া অনেকটাই সুস্থ। খাওয়াদাওয়া করছে, স্বাভাবিকভাবে কথাও বলছে। দায়িত্বরত নার্সরা জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। পরে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, তার হাম হয়নি, তবে হামের উপসর্গ ছিল।

নার্সদের বক্তব্য ও রোগীর চাপ

হাসপাতালের একাধিক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালেও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু রোগীর স্বজনরা ধৈর্য ধরতে চান না। সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগী নিয়ে মেডিক্যালে চলে আসেন। ফলে এখানে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, যেখানে তিনটি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ৫০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, সেখানে প্রতিদিন ২০০-এর বেশি হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে।

রোগীর স্বজনদের অভিজ্ঞতা

ভোলার লালমোহনের বাসিন্দা কাঞ্চন শিকদার বলেন, “উপজেলা হাসপাতালে থাকলে আমার নাতিকে বাঁচাতে পারতাম না। বড় ডাক্তার তো মেডিকেলেই থাকে। তাই এখানে নিয়ে এসেছি।” ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার বাসিন্দা সালাম জমাদ্দার বলেন, “উপজেলা হাসপাতালে গেলে নানা কথা শুনতে হয়। তাই টাকা ধার করেও শিশুকে মেডিক্যালে নিয়ে এসেছি।” তিনি বলেন, “এখানে চিকিৎসা ভালো মিলছে। কিন্তু রোগী এত বেশি যে বেড পাওয়া যাচ্ছে না। আমার ছয় মাসের শিশুর সঙ্গে আরেকটি শিশু একই বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে।”

পিরোজপুর থেকে আসা আট মাস বয়সী রাব্বানীর মা জানান, জেলা হাসপাতালে দুই দিন চিকিৎসার পরও উন্নতি না হওয়ায় আত্মীয়দের পরামর্শে বরিশাল মেডিকেলে ভর্তি করান শিশুকে। তিনি বলেন, “হাসপাতালের নেবুলাইজার সবাই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে। অনেক সময় অন্যের কাছ থেকে নিয়ে শিশুকে নেবুলাইজার দিতে হচ্ছে।”

ওষুধ সংকট ও ব্যবস্থাপনা

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ওষুধই বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে মূলত স্যালাইন ও সাধারণ কিছু ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাম রোগীর চাপ বাড়ায় নিচতলার ডায়রিয়া ওয়ার্ড ও দ্বিতীয় তলার শিশু বিভাগকে হাম ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতেও চিকিৎসা চলছে। সূত্রটি জানায়, হাসপাতালের ৫০টি বেড ও ৩০টি নেবুলাইজারের বিপরীতে বর্তমানে রোগী রয়েছে ২০০-এর বেশি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনীর বলেন, “হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার পাশাপাশি পদ্মা সেতুর এপারের ১১ জেলা থেকেও রোগী আসছে।” তিনি বলেন, “জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে এত চাপ তৈরি হতো না। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে। বেড ও নেবুলাইজারের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।”

পরিসংখ্যান ও মৃত্যু

মেডিক্যাল সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ মে পর্যন্ত শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৫৬১ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২ হাজার ৪০৪ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে ৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে কোনও শিশুর মৃত্যু হয়নি।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম জানান, একই সময়ে বিভাগের ছয় জেলায় সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩ হাজার ৩৯৪ জন। নিশ্চিত হাম আক্রান্ত ছিল ২২১ জন। এদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সন্দেহজনক হামের উপসর্গে মারা গেছে আরও ১২ জন।