ফউজুল আজিম: নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের হাতেও নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াই—কেন থামছে না?
প্রশ্নের উত্তর
এই প্রশ্নের উত্তর একটি জায়গায় গিয়ে বারবার ঠেকে। সেটা হলো বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। নারী ও শিশু নির্যাতন নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক ব্যাধি। এর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক মূল্যবোধ গঠন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ—সবকিছু একসঙ্গে দরকার। কিন্তু এই সব উদ্যোগের পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটি হলো অপরাধের দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। কারণ, শাস্তির ভয় না থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমান বাস্তবতা হলো একটি ধর্ষণ বা ধর্ষণ-হত্যার মামলায় বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পর হাইকোর্টে আপিল, তারপর আপিল বিভাগে রিভিশন, রিভিউ এবং সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ—পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ২৫ থেকে ৩০ বছর লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিচারের ফলাফল সমাজে কোনো দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে না।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে শত শত একই ধরনের অপরাধ ঘটতে থাকে। কারণ, সমাজ দেখে না যে বিচার হচ্ছে, শাস্তি হচ্ছে। অপরাধী জানে, বিচারপ্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘ যে শাস্তির বাস্তব আশঙ্কা তেমন নেই।
ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
ফেনীর মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর হত্যা মামলার কথা বলা যায়। সেই মামলায় পিবিআই দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত সম্পন্ন করেছিল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অল্প কর্মদিবসে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন। সেটি ছিল একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু সেই রায় কার্যকর হতে আজও বছরের পর বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। যদি ওই ১৬ জনের শাস্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর হতো, সারা দেশে তার একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছাত। মানুষ দেখত যে এত বড় অপরাধের এত কঠোর পরিণতি হয়েছে। সেই বার্তা হাজার সচেতনতামূলক কর্মসূচির চেয়ে বেশি কার্যকর হতো।
সবার জন্য সমান বিচার
শুধু আলোচিত বা মিডিয়া কভারেজ পাওয়া মামলায় দ্রুততা দেখালে হবে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে মেয়েটি বা শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, মিডিয়া যার কথা জানে না, তার মামলারও একই গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সেই মামলাগুলো বিচারিক আদালতেই ১০ থেকে ১২ বছর পড়ে থাকে। তারপর উচ্চ আদালতে আরও কত বছর—হিসাব করলে আঁতকে উঠতে হয়। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা
বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে আপিল বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতির বিবেচনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ঘটনার এক বছরের মধ্যে বিচারিক আদালতে রায়, হাইকোর্টে আরও ছয় মাস, আপিল বিভাগে আরও ছয় মাস—এভাবে তিন বছরের মধ্যে শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হলে সমাজে তার প্রভাব পড়বে।
দেশে এখন এক শর বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, রয়েছে সত্তরের বেশি শিশু ধর্ষণ অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
উপসংহার
অপরাধ দমনের জন্য আইনে যে শাস্তি, সেই শাস্তির ফল যদি সমাজ সময়মতো দেখতে না পায়, তাহলে শুধু আইন সংশোধন করে কিছু হবে না। বিচারের গতিই পারে অপরাধীর মনে প্রকৃত ভয় তৈরি করতে।
ফউজুল আজিম, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ



