জয়েন্টের ব্যথা এখন একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। মূলত হাড় ও শরীরের গঠনগত সমস্যার কারণে এ ধরনের ব্যথা দেখা দেয়। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জয়েন্টের ব্যথার প্রধান দুটি কারণ হলো রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (আরএ) এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিস (ওএ)। তবে অনেক রোগী এই দুই রোগকে এক মনে করেন, যদিও চিকিৎসকদের মতে এদের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব পেইনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৭০ কোটির বেশি মানুষ মাংসপেশি ও হাড়সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন। তাই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের পার্থক্য জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কী?
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের সুস্থ টিস্যুকেই আক্রমণ করে। বিশেষ করে জয়েন্টের চারপাশের আবরণী বা সিনোভিয়ামে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। ফলে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা ও তীব্র প্রদাহ দেখা দেয়। এ রোগ শুধু জয়েন্টেই সীমাবদ্ধ নয়। ত্বক, চোখ, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসা ও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস কী?
অন্যদিকে অস্টিওআর্থ্রাইটিস মূলত ‘ওয়্যার অ্যান্ড টিয়ার’ বা ধীরে ধীরে ক্ষয়জনিত সমস্যা। এতে হাড়ের প্রান্তে থাকা কার্টিলেজ বা নরম সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষয় হতে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং সাধারণত হাঁটু, কোমর ও মেরুদণ্ডের মতো ওজন বহনকারী জয়েন্টে বেশি দেখা যায়।
দুই রোগের প্রধান পার্থক্য
কারণ: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস অটোইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে প্রদাহ, অন্যদিকে অস্টিওআর্থ্রাইটিস জয়েন্টের দীর্ঘদিনের ক্ষয় ও চাপের কারণে হয়।
রোগের অগ্রগতি: আরএ কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই দ্রুত বাড়তে পারে, অন্যদিকে ওএ ধীরে ধীরে বহু বছরে তৈরি হয়।
জয়েন্ট আক্রান্ত হওয়ার ধরন: আরএ সাধারণত শরীরের দুই পাশের একই জয়েন্টে একসঙ্গে হয়, অন্যদিকে ওএ সাধারণত নির্দিষ্ট একটি জয়েন্ট বা এক পাশেই বেশি হয়।
লক্ষণ: আরএ দীর্ঘ সময় সকালের জড়তা, ফোলা, ক্লান্তি ও জ্বর; ওএ চলাফেরার পর ব্যথা বাড়া, বিশ্রামে কমে যাওয়া ও জয়েন্টে চাপ অনুভব।
বয়স: আরএ যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে ৩০-৫০ বছরের মধ্যে বেশি দেখা যায়; ওএ মূলত বয়স্কদের রোগ।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ
- সকালে দীর্ঘ সময় জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- হালকা জ্বর
- ওজন কমে যাওয়া
- শরীর দুর্বল লাগা
- শরীরের দুই পাশের একই জয়েন্টে ব্যথা
অস্টিওআর্থ্রাইটিসের লক্ষণ
- চলাফেরা বা কাজের পর ব্যথা বেড়ে যাওয়া
- বিশ্রামের পর অল্প সময়ের জন্য জয়েন্ট শক্ত লাগা
- জয়েন্ট নাড়াচাড়ায় খসখসে বা কড়মড় শব্দ হওয়া
ঝুঁকির কারণ
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: জেনেটিক কারণ, ধূমপান বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মতো পরিবেশগত কারণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস: বয়স বৃদ্ধি, স্থূলতা, পুরনো আঘাত এবং দীর্ঘদিন একই ধরনের শারীরিক চাপ এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
রোগ নির্ণয়ে কী বলেন চিকিৎসকরা?
ভারতের ডা. জয়ন্ত অরোরা বলেন, ‘সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়।’ তার মতে, অস্টিওআর্থ্রাইটিস সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা ও এক্স-রের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। এক্স-রেতে জয়েন্টের ফাঁকা অংশ কমে যাওয়া বা হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি দেখা যায়। অন্যদিকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নির্ণয়ে রক্ত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর (আরএফ), অ্যান্টি-সিসিপি অ্যান্টিবডি, ইএসআর ও সিআরপি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রদাহের মাত্রা নির্ণয় করা হয়।
চিকিৎসা পদ্ধতির পার্থক্য
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: এ রোগে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে রোগের অগ্রগতি ধীর করা হয়। এজন্য বায়োলজিক ওষুধ, কর্টিকোস্টেরয়েড এবং প্রদাহনাশক ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস: এ ক্ষেত্রে ব্যথা কমানো, ফিজিওথেরাপি, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে জয়েন্ট সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, গুরুতর অবস্থায় জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারিরও প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে উন্নত রোবোটিক প্রযুক্তির সাহায্যে আরও নিখুঁত ও দ্রুত পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে।
জয়েন্ট ভালো রাখতে করণীয়
- শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- সাঁতার, সাইক্লিং ও যোগব্যায়ামের মতো হালকা ব্যায়াম করা
- ওমেগা-৩ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
- হলুদের মতো প্রদাহরোধী উপাদান খাদ্যতালিকায় রাখা
- দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে না থাকা
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে জয়েন্টে ব্যথা থাকলে, ফোলা বা গরম অনুভূত হলে কিংবা স্বাভাবিক চলাচল কমে গেলে দ্রুত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ বা রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়ানো সম্ভব এবং রোগীর জীবনযাত্রার মানও অনেক ভালো থাকে।



