কর্মক্ষেত্রে প্রচলিত ‘অ্যাটেন্ডেন্স পয়েন্ট পদ্ধতি’ কর্মীদের অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক কাজে আসতে বাধ্য করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় এমনটাই দাবি করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা কর্মীদের ব্যক্তিগত সুস্থতা, সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
গবেষণার বিস্তারিত
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে, স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটি এবং ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের যৌথ পরিচালনায় এই গবেষণাটি চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতির জন্য শাস্তিমূলক পয়েন্ট বা ডিমেরিট সিস্টেম রয়েছে, সেখানকার কর্মীরা অসুস্থ অবস্থায়ও কাজে আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি—এমনকি তাদের জন্য ‘পেইড সিক লিভ’ বা সবেতন অসুস্থতাজনিত ছুটির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও।
গবেষণার এই ফলাফল ইঙ্গিত করে যে, কর্মীদের সহায়তার জন্য তৈরি করা কল্যাণমূলক নীতিগুলোকেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম পরোক্ষভাবে ভেস্তে দিচ্ছে।
অ্যাটেন্ডেন্স স্কোরের নেপথ্যে অদৃশ্য চাপ
অনেক নিয়োগকর্তাই বর্তমানে পয়েন্ট-ভিত্তিক উপস্থিতি ব্যবস্থা ব্যবহার করেন। যেখানে কোনো কর্মী অনুপস্থিত থাকলে, দেরিতে আসলে বা কাজ শেষ হওয়ার আগে চলে গেলে তাকে নেতিবাচক পয়েন্ট দেওয়া হয়। কিছু কিছু কোম্পানিতে এই পয়েন্টের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমা পার হয়ে গেলে কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এমনকি চাকরিচ্যুতও করা হতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই জানান যে তারা এই ধরণের কঠোর ব্যবস্থার মুখোমুখি হন। গবেষকরা দেখেছেন, কর্মক্ষেত্রে কেবল এই উপস্থিতি পয়েন্ট পদ্ধতির অস্তিত্বই কর্মীদের অসুস্থ শরীরে অফিসে আসতে বাধ্য করার জন্য যথেষ্ট। আর যেসব কর্মী ইতোমধ্যে কিছু পয়েন্ট পেয়ে গেছেন বা শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
কর্পোরেট টিমের জন্য এটি কেন চিন্তার বিষয়?
অফিস কর্মীদের ক্ষেত্রে অসুস্থ অবস্থায় কাজে আসাকে অনেকে ‘কাজের প্রতি নিষ্ঠা’ হিসেবে দেখতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অসুস্থ অবস্থায় কাজ করার এই প্রবণতা উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে, রোগ থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে এবং পুরো টিমের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বহু কর্মী শুধুমাত্র শাস্তিমূলক পয়েন্ট এড়ানোর জন্যই অসুস্থ শরীরে অফিসে উপস্থিত হন। গবেষকদের মতে, শাস্তির ভয় সবেতন ছুটির সুবিধাকেও ফিকে করে দেয়, যার ফলে কর্মীদের সামনে আসলে কোনো বাস্তব বিকল্প খোলা থাকে না।
শুধু সবেতন ছুটিই যথেষ্ট নয়
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো, ‘পেইড সিক লিভ’ বা সবেতন ছুটির আইনি বাধ্যবাধকতাও এই উপস্থিতি পয়েন্ট পদ্ধতির নেতিবাচক প্রভাবকে কমাতে পারছে না। কর্মীরা আইনিভাবে ছুটির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও, পয়েন্ট কাটার ভয় থাকলে তারা অসুস্থ শরীর নিয়েই ডেস্কে ফিরছেন।
তাই গবেষকদের পরামর্শ, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আসলেই একটি সুস্থ ও ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তৈরি করতে চায়, তবে তাদের ওয়েলবিয়িং প্রোগ্রামের পাশাপাশি এই উপস্থিতি নীতিগুলোও পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা
বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে, সেখানে এই গবেষণাটি একটি বড় প্রশ্ন চিহ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রচলিত উপস্থিতি নীতিগুলো কি আসলেই কোম্পানির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোম্পানিগুলোকে এখন কাজের ধারা বজায় রাখা এবং কর্মীদের অসুস্থতার সময় নিশ্চিন্তে ছুটি নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। শাস্তির ভয়হীন এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে কর্মীরা সুস্থ হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পাবেন, যা চূড়ান্ত বিচারে কর্মী এবং নিয়োগকর্তা উভয় পক্ষকেই লাভবান করবে।
সূত্র: এনডিটিভি



