চিকেন পক্সের মতো কিছু রোগ আমাদের জীবদ্দশায় সাধারণত একবার হয়। কারণ, এগুলো আমাদের শরীরে আজীবনের জন্য রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি করে দেয়। অথচ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর মতো রোগে মানুষ বারবার আক্রান্ত হয়। সে জন্য প্রতিবছর নতুন করে টিকা বা ভ্যাকসিন নিতে হয়। কিন্তু এমনটা কেন হয়? কেন কিছু রোগ একবার হলে আর হয় না, কিন্তু অন্যগুলো বারবার হয়?
অ্যান্টিবডির ভূমিকা
কোনো রোগের বিরুদ্ধে আমাদের শরীর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলবে কি না, তা মূলত নির্ভর করে অ্যান্টিবডির ওপর। অ্যান্টিবডি হলো বিশেষ একধরনের প্রোটিন, যা শরীরে কোনো জীবাণু প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৈরি হয়। এটি আমাদের শরীরের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রধান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। অ্যান্টিবডি আক্রমণকারী জীবাণুগুলোকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে ও সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে জীবাণুগুলোকে আমাদের কোষ দখল করে বংশবৃদ্ধি করতে বাধা দেয়।
শরীরের সংক্রমণ বা রোগ সেরে যাওয়ার পর সাধারণত অ্যান্টিবডির সংখ্যা কমে আসে। তবে কিছু অ্যান্টিবডি সব সময় রক্তে থেকে যায়। এরা মূলত পাহারাদারের মতো কাজ করে। যেন একই জীবাণু আবার আক্রমণ করলে দ্রুত নিজেদের সংখ্যা বাড়িয়ে লড়াই শুরু করতে পারে। এ কারণে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা বুঝতে পারেন অতীতে কখনো সেই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল কি না। এই পুরো প্রক্রিয়াটির কারণে আমরা সাধারণত একই রোগে দ্বিতীয়বার সহজে অসুস্থ হই না।
কেন কিছু রোগ বারবার হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা মেডিকেল স্কুলের ইমিউনোলজির বিজ্ঞানী মার্ক জেনকিন্স বিষয়টা নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, আমরা যখন কোনো রোগে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হই, তখন সাধারণত এর কারণ এটা নয় আমাদের শরীর তার প্রতিরোধক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এর পেছনে মূল কারণ দুটি। হয় রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুটি নিজের রূপ বদলে ফেলেছে, যার ফলে আমাদের শরীর তাকে আর চিনতে পারছে না। অথবা আমাদের শরীর প্রথমবার ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে খুব শক্তিশালী কোনো প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উদাহরণ
উদাহরণ হিসেবে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভাইরাসের কথা বলা যায়। এই ভাইরাসটি খুব সহজেই নিজের জিনগত রূপ পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা যখন এই ভাইরাসের একটি রূপকে চিনে মেরে ফেলে, তখনই ভাইরাসটি নতুন আরেকটি রূপ নিয়ে হাজির হয়। ফলে আমাদের শরীর তাকে আর নতুন করে চিনতে পারে না। তবে সব ভাইরাস এত সহজে নিজের রূপ বদলাতে পারে না। যেমন পোলিও ভাইরাস সহজে এর জিনগত কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে না। এ কারণে বিশ্ব থেকে পোলিও রোগটিকে প্রায় পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।
সর্দি-কাশির মতো রোগ
ওরেগন ন্যাশনাল প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টারের ইমিউনোলজির বিজ্ঞানী মার্ক স্লিফকা জানান, সাধারণ সর্দি–কাশির মতো কিছু ভাইরাস আমাদের পুনরায় আক্রান্ত করে। এ ভাইরাসগুলো সাধারণত শ্বাসনালি বা গলার ওপরের অংশ অতিক্রম করে শরীরের ভেতরে ঢুকতে পারে না। তবে এগুলো বারবার হওয়ার কারণ ভাইরাসের দ্রুত রূপ বদলানো নয়। বরং আমাদের শরীর প্রথম থেকেই এই জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে খুব একটা অ্যান্টিবডি তৈরি করে না। আমাদের শরীর শ্বাসনালির মতো বাইরের অংশগুলো নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় না।
কোভিড-১৯–এর মৃদু উপসর্গের ক্ষেত্রেও ঠিক এই বিষয়টিই দেখা যায়। তখন ভাইরাসটি শরীরের ভেতরে না গিয়ে ফুসফুসের ওপরের অংশে বা শ্বাসনালিতে আটকে থাকে। ফলে শরীর একে খুব বড় কোনো হুমকি বা বিপদ হিসেবে মনে করে না। শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘মেডআরক্সাইভ’ (MedRxiv) ডেটাবেজে প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত মৃদু উপসর্গের ১৭৫ জন রোগীর মধ্যে ১০ জন রক্তে কোনো শনাক্তযোগ্য অ্যান্টিবডি তৈরি না করে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
কেন কিছু রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয়?
কিছু রোগ দ্রুত রূপ বদলায় না। আবার প্রথম আক্রমণেই এগুলো শরীরে খুব শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করে। এই রোগগুলো আগের দুটি নিয়মের কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। এসব রোগের ক্ষেত্রে আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি অনেক বেশি দিন স্থায়ী হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জার্নাল ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত ২০০৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাম বা মাম্পসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর শরীর যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, তার অর্ধেক পরিমাণ কমে যেতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লেগে যাবে। একই গবেষণায় ‘এপস্টাইন-বার’ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম দীর্ঘস্থায়ী ফলাফলের প্রমাণ মিলেছে।
তবে সব রোগের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডির এই স্থায়িত্ব আজীবন হয় না। ওই একই গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের শরীরে জলবসন্তের বা পক্সের অ্যান্টিবডির অর্ধেক বিলুপ্ত হতে প্রায় ৫০ বছর সময় লাগে। আর টিটেনাসের ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিবডির অর্ধেক ফুরিয়ে যেতে সময় লাগে মাত্র ১১ বছর। নির্দিষ্ট সময় পর পর বুস্টার ডোজ বা টিকা না নিলে তাত্ত্বিকভাবে যে কেউ প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে পৌঁছেও এই রোগগুলোতে পুনরায় আক্রান্ত হতে পারেন।
অজানা রহস্য
বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন কেন কিছু রোগের ক্ষেত্রে আমাদের শরীরের অ্যান্টিবডি অনেক বেশি দিন টিকে থাকে। আর অন্যগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত কমে যায়। এটা হওয়া খুবই সম্ভব যে জলবসন্ত বা মোনোর মতো কিছু পরিচিত রোগ আমাদের অজান্তেই বারবার আক্রমণ করে। কিন্তু আমাদের শরীরে আগে থেকে থাকা অ্যান্টিবডিগুলো আমরা টের পাওয়ার আগেই সেই জীবাণুকে ধ্বংস করে দেয়। আর প্রতিবার এমনটা হওয়ার ফলে আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নতুন করে বুস্টার বা শক্তি পায়, যা একে আবার পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। এই ছোটখাটো আক্রমণগুলো আসলে আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে সারাক্ষণ সতর্ক ও সজাগ রাখে, যাতে আমরা সে রোগে আর আক্রান্ত না হই।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স



