হামের প্রাদুর্ভাবকে 'মহামারি' ঘোষণার জরুরি দাবি চিকিৎসকদের
দেশে চলমান হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'মহামারি' হিসেবে ঘোষণা করে তাৎক্ষণিক জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে 'হামে শিশুমৃত্যু : জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়' শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা এই জোরালো দাবি উপস্থাপন করেন।
জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতির সংজ্ঞা ও বর্তমান অবস্থা
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, যখন কোনো রোগের বিস্তার সময়, স্থান ও আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় অস্বাভাবিক ও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায় এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তা সামাল দিতে সম্পূর্ণরূপে হিমশিম খায়, তখন সেটি জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে গণ্য হয়। ডিপিপিএইচের মতে, বর্তমানে হামের বিস্তার ঠিক সেই পর্যায়েই পৌঁছেছে, যেখানে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, 'সরকার ইতিমধ্যে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিলসহ বিভিন্ন প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে। কিন্তু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিস্থিতিকে জরুরি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি, যা একটি বড় শূন্যতা।'
হামের দ্রুত বিস্তার ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির উদ্বেগ
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, হাম একটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ানো রোগ এবং টিকা দেওয়ার পর এর পূর্ণ কার্যকারিতা পেতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবা প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ এখনই জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেন, 'আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে মাত্র তিনজনের মৃত্যু হতো, কিন্তু বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে দশজনে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ। মৃত্যুহার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।'
প্রান্তিক শিশুদের ক্ষতি ও টিকাদান কর্মসূচির সমালোচনা
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা, যাদের কাছে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। শিশু বিশেষজ্ঞ কাজী রকিবুল ইসলাম সরাসরি অভিযোগ করেন, হামের টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি পরবর্তী জটিলতা প্রতিরোধেও যথাযথ ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ডিপিপিএইচ-এর প্রস্তাবিত জরুরি উদ্যোগসমূহ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংগঠনটি সরকারের কাছে কয়েকটি তাৎক্ষণিক ও কার্যকর উদ্যোগের প্রস্তাব পেশ করে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- সারা দেশে অবিলম্বে ব্যাপক গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা।
- আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো জোরদার করা।
- টিকা নিয়ে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও সামাজিক গুজব প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা।
- আধুনিক ও শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা।
ডিপিপিএইচের এই আহ্বান ও প্রস্তাবনা বর্তমান হাম সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা দেশের শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।



