হামের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আইইউবির বিশেষ সেমিনার
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) পাবলিক হেলথ বিভাগ বুধবার (৮ এপ্রিল ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিএমকে লেকচার গ্যালারিতে "আউটব্রেক অ্যালার্ট: প্রোটেক্টিং আওয়ার কমিউনিটি ফ্রম মিসেলস" শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করে। বাংলাদেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বিশেষ আয়োজন করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে হাম সংক্রমণে বহু শিশুর মৃত্যু এবং দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাজারো রোগী ভর্তি হওয়ার ঘটনা এই উদ্যোগের পেছনে মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল বক্তব্য ও পরামর্শ
সেমিনারে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়ে হাম প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্স ও প্যারা ক্লিনিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডিন এবং সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে হাম সম্পর্কে সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে ১৯৯০ সালের পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা টিকাদানের কারণে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।
অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, "যারা আগে হাম আক্রান্ত হয়েছেন, তারাও সাধারণত নিরাপদ, কারণ তারা প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। টিকা নেওয়া মায়েরা তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তর করেন বলেও আমরা জানি।" তিনি আরও সতর্ক করে দেন যে ১২ মাসের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা এর চেয়ে বেশি বয়সের শিশু, টিকা না নেওয়া ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল—তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী ও সংক্রমণ পদ্ধতি
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে ১–৫ বছরের শিশুদের জন্য হাম বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এই বয়সের শিশুরা গুরুতর জটিলতার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে, যেখানে বড় শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে থাকে। হাম ভাইরাস কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়, বিশেষ করে গণপরিবহন, শ্রেণিকক্ষ, মিলনায়তন বা বিমানবন্দরের মতো বদ্ধ স্থানে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। তবে অতীতের ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির কারণে চলতি বছর এই প্রাদুর্ভাব মহামারিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন, আইইডিসিআর ও ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টারের পরিচালক, তাঁর বক্তব্যে বলেন, কোনো এলাকায় এক মাসে তিন বা তার বেশি হাম আক্রান্তের ঘটনা ঘটলে সেটিকে সন্দেহভাজন প্রাদুর্ভাব ধরা হয়, আর একই সময়ে দুইটি নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেলে সেটি নিশ্চিত প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ আক্রান্তই টিকা না নেওয়া শিশু।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও রোগের লক্ষণ
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন ইপিআই বা টিকাদান কর্মসূচি মূল ভূমিকা পালন করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কারিগরি সহায়তা দেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইইডিসিআর সহায়তা করে। হামের ইনকিউবেশন সময় সাধারণত ৩–৫ দিন, এই সময়ে উপসর্গ পুরোপুরি প্রকাশ পায় না, যদিও ভাইরাস শরীরে সক্রিয় থাকে।
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ তাওফিক বলেন, উপসর্গের দিক থেকে হাম অনেকটা সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগের মতো—জ্বর, সর্দি ও শরীরে র্যাশ দেখা যায়। তবে কেবল র্যাশ থাকলে এবং জ্বর বা সর্দি না থাকলে সেটি হাম নাও হতে পারে। হাম হলে সাধারণত জ্বর কম মাত্রায় শুরু হয়ে ১০১–১০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ে এবং তিন থেকে চার দিন স্থায়ী হয়।
তিনি আরও বিস্তারিতভাবে বলেন, "সাধারণত তৃতীয় দিন থেকে শিশুর কপালে চুলের গোড়া, কানের আশপাশে ও মাথার পেছন থেকে র্যাশ শুরু হয়, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়ে, এবং ধীরে ধীরে সেই র্যাশ শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ত্বকে র্যাশ ওঠার আগেই মুখের ভেতরে বালুকণার মতো ছোট দাগ দেখা যায়, যা সম্ভাব্য হাম সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।"
সামাজিক মাধ্যমের বিভ্রান্তি ও চিকিৎসা পরামর্শ
অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ তাওফিক আরও সতর্ক করেছেন যে হাম সংক্রমণ বা রোগ নির্ণয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত অযথা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ বা উদ্বেগ থাকলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। তিনি শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানান।
আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া বক্তব্য দেন আইইউবির স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের ডিন ড. কামরান উল বাসেত এবং স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের ডিন ড. কে আয়াজ রব্বানী। এই সেমিনারটি হাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



