শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাছিমা সুলতানার বয়স ৫৫ পেরিয়েছে। প্রায় সাত বছর আগে স্বামী বি এম শাহজাহানের মৃত্যুর পর তিনি ছেলেকে আকড়ে ধরে জীবনযাপন করছিলেন। ৯ মাস আগে সেই ছেলে কিডনি জটিলতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন ছেলেকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করবেন।
গতকাল রোববার (১০ এপ্রিল) বিশ্ব মা দিবসের রাতে নাছিমার শরীর থেকে একটি কিডনি নিয়ে তাঁর ছেলে নাছিম জাহানের (২৮) শরীরে প্রতিস্থাপন করেছেন চিকিৎসক। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন তাঁরা। নাছিমা সুলতানার গ্রামের বাড়ি জাজিরা পৌরসভার উত্তর বাইকশা এলাকায়। তিনি উপজেলার খলিফাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
পরিবার ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নাছিমা সুলতানা। তাঁর স্বামী শাহজাহান একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ওই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর ছেলে নাছিমকে নিয়েই চলছিল তাঁদের সংসার। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে শাহজাহানের মৃত্যু হয়।
পরে সংসারের হাল ধরতে ২০২৫ সালে কুয়েতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নাছিম। কিন্তু সেখানে রওনা দেওয়ার সাত দিন আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে ছোটেন নাছিমা। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, ছেলে কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর দুটি কিডনি শতভাগ অকেজো হয়ে গেছে। তাঁকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত ডায়ালাইসিস চলছিল। সপ্তাহে ২-৩ বার তাঁর কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছিল। এর মধ্যে নাছিমা ছেলেকে একটি কিডনি দানের সিদ্ধান্ত নেন।
সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গতকাল রোববার রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের চিকিৎসক কামরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে মা ও ছেলের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে স্বজনেরা জানান, তাঁরা দুজন আপাতত সুস্থ আছেন। নাছিমার মেয়ে সিফাত জাহান বলেন, 'মা আমাদের ভাই ও বোনকে খুব ভালোবাসেন। তিনি নিজেই তাঁর একটি কিডনি ভাইকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মা তো আমাদের নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন—ভাইকে কিডনি দেওয়ার মাধ্যমে তিনি যেন এটিই প্রমাণ করলেন। এমন মা কয়জনার হয়? মাকে নিয়ে গর্ব হয়।'
খলিফাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খান মাসুদ বলেন, নাছিমা সুলতানা ৩ এপ্রিল থেকে তিন মাসের জন্য চিকিৎসাজনিত ছুটিতে আছেন। তিনি সন্তানকে বাঁচাতে নিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মা ও ছেলের সুস্থতার জন্য দোয়া রইল।



