আপনার হাতের স্মার্টফোনের ক্যামেরা হয়তো অনেক আধুনিক। হয়তো তাতে ৫০, ১০০ বা ২০০ মেগাপিক্সেলের শক্তিশালী সেন্সর বসানো আছে। আপনি হয়তো ভাবেন, আপনার ফোনটা পৃথিবীর যেকোনো সুন্দর দৃশ্য একদম নিখুঁতভাবে ক্যামেরাবন্দী করতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় হয়তো ফোনের ক্যামেরার প্রশংসা করতে করতে আপনি ক্লান্ত হয়ে যান। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার নিজের কাছেই এমন এক জোড়া ক্যামেরা আছে, যা এই পৃথিবীর যেকোনো অত্যাধুনিক ক্যামেরার চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী? হ্যাঁ, আপনার চোখের কথাই বলছি!
আপনার চোখের জাদুকরি ক্ষমতা
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, বিশাল নীল আকাশ, বিকেলের লালচে রোদ, গাছের পাতার গাঢ় সবুজ আভা কিংবা প্রজাপতির ডানার শত শত নকশা—এত এত রং আপনার চোখ কীভাবে চিনে ফেলে? আচ্ছা, আপনাকে যদি সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, মানুষের চোখ ঠিক কতগুলো আলাদা রং দেখতে বা চিনতে পারে? উত্তরটা শুনলে আপনি সত্যিই চমকে যাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজির বিজ্ঞানীদের মতে, একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের চোখ প্রায় এক কোটি ভিন্ন ভিন্ন রং আলাদাভাবে চিনতে পারে! একটু কল্পনা করে দেখুন তো সংখ্যাটা! আপনি হয়তো রংপেনসিলের বাক্সে ১২টি, ২৪টি বা বড়জোর ৪৮টি রং দেখেছেন। রঙের দোকানে গেলে হয়তো শেডকার্ডে কয়েক শ বা হাজারখানেক রঙের শেড দেখতে পান। কিন্তু আপনার চোখের ভেতরে যে জাদুকরি ক্ষমতা লুকিয়ে আছে, তা দিয়ে আপনি এক কোটি আলাদা রঙের পার্থক্য খুব সহজেই বুঝতে পারেন। আপনি যখন কোনো দোকানে গিয়ে জামা কিনেন, তখন কোনটা হালকা নীল, কোনটা আসমানি আর কোনটা গাঢ় নেভি ব্লু, তা এক নিমেষেই আলাদা করে ফেলেন।
চোখের পেছনের জাদুকর
কিন্তু এত রং চোখ কীভাবে চেনে? এর পেছনের জাদুকর আসলে কে? এই জাদুকর লুকিয়ে আছে আপনার চোখের একদম ভেতরের অংশে। একে বলা হয় রেটিনা। রেটিনার ভেতরে লাখ লাখ ক্ষুদ্র কোষ বা সেল থাকে। রং চেনার জন্য যে কোষগুলো কাজ করে, বিজ্ঞানের ভাষায় তাদের বলা হয় ‘কোন সেল’। এগুলো দেখতে অনেকটা আইসক্রিমের কোনের মতো বলেই বিজ্ঞানীদের দেওয়া এমন চমৎকার নাম।
সাধারণত একজন মানুষের চোখে তিন ধরনের কোন সেল থাকে। লাল, সবুজ ও নীল। এ তিনটি মূল আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয় চোখ। যখনই আপনি কোনো রঙিন জিনিসের দিকে তাকান, তখন সেখান থেকে আলো এসে আপনার চোখের রেটিনার এই কোন সেলগুলোয় ধাক্কা দেয়।
মজার ব্যাপার হলো, চোখ কিন্তু নিজে নিজে রং তৈরি করে না। চোখের কাজ হলো শুধু আলোর সংকেতগুলো ধরে ফেলা। এরপর চোখ সেই সিগন্যালগুলো স্নায়ুর মাধ্যমে চোখের পলকে সোজা পাঠিয়ে দেয় আপনার মস্তিষ্কে।
মস্তিষ্ক হলো আসল চিত্রশিল্পী
মস্তিষ্ক লাল, সবুজ ও নীল আলোর এই সিগন্যালগুলোকে এমন নিখুঁতভাবে মেশায় যে সেখান থেকে প্রায় এক কোটি ভিন্ন ভিন্ন রঙের শেড তৈরি হয়ে যায়। ঠিক যেমন চিত্রশিল্পীরা প্যালেটের মধ্যে তিনটি মূল রং মিশিয়ে হাজারো নতুন রং তৈরি করেন, আপনার মস্তিষ্কও ঠিক সে কাজটিই করে সারাক্ষণ! আর এভাবেই আপনি বুঝতে পারেন রঙের অতি সূক্ষ্ম সব পার্থক্য।
টেট্রাক্রোম্যাসি: রং দেখার বিরল ক্ষমতা
এতক্ষণ তো জানলেন সাধারণ মানুষের এক কোটি রং দেখার কথা। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের চোখ সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী! বিজ্ঞানের ভাষায় চোখের এই বিরল জেনেটিক বৈশিষ্ট্যটিকে বলা হয় টেট্রাক্রোম্যাসি। কঠিন এই শব্দের মানে কী?
যাদের চোখে এই অদ্ভুত সুন্দর বৈশিষ্ট্যটি থাকে, তাদের রেটিনায় সাধারণ মানুষের মতো তিনটি নয়; বরং চার ধরনের কোন সেল থাকে! একটি মাত্র অতিরিক্ত কোন সেল থাকার কারণে তাদের রং দেখার ক্ষমতা প্রায় অসীম হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ যেখানে এক কোটি রং দেখতে পায়, সেখানে একজন টেট্রাক্রোম্যাট মানুষ প্রায় ১০ কোটি ভিন্ন রঙের পার্থক্য নিখুঁতভাবে ধরতে পারে!
ভাবুন একবার! আপনি হয়তো বাগানের কোনো একটি পাতাকে শুধু সাধারণ সবুজ রঙের দেখছেন, কিন্তু একজন টেট্রাক্রোম্যাট সেই একই পাতার মধ্যে সবুজের এমন সব অদ্ভুত শেড দেখতে পাবেন, যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। তাদের কাছে এই পৃথিবী সাধারণ মানুষের চেয়ে আরও অনেক বেশি রঙিন, আরও অনেক বেশি প্রাণবন্ত।
সূত্র: আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজি



