কিশোর গ্যাং: মাদক ও অপরাধের ভয়াবহ চক্র, সমাজে ব্যাপক উদ্বেগ
কিশোর গ্যাং: মাদক ও অপরাধের ভয়াবহ চক্র

দেশের নগর ও গ্রামীণ সমাজে বেশ কিছু বছর ধরে ‘কিশোর গ্যাং' নামক সামাজিক ব্যাধি ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্যাং-সংস্কৃতির মূল উৎস হলো ‘মাদক’। মাদক কেবল ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না—এটি একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মকে সহিংসতা, অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়।

বয়স ও মাদকাসক্তির উদ্বেগজনক চিত্র

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি কিশোর-তরুণদের মধ্যে এই আসক্তি সর্বাধিক। যাদের হাতে বই থাকার কথা, তারা আজ ইয়াবা ও গাঁজার মতো ভয়াবহ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়ের পূর্বলক্ষণ।

রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী প্রভৃতি এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রসহ কিশোরদের ঘুরে বেড়ানো এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নির্দেশ করে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তির ভঙ্গুরতাও প্রকাশ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অপরাধপরিধি ও অপরাধ অর্থনীতি

এই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপরিধি সীমাবদ্ধ নয়। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি থেকে শুরু করে ভাড়ায় খুন পর্যন্ত—সমস্ত অপরাধ চক্রে তাদের সম্পৃক্ততা লক্ষ করা যায়। আরো উদ্বেগজনক হলো, তথাকথিত ‘বড় ভাই' এবং প্রভাবশালী মহলের একটি অংশ এই কিশোরদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ফলে কিশোররা অপরাধের কেবল বাহকই নয়; তারা একটি সুসংগঠিত অপরাধ অর্থনীতির অংশে পরিণত হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও প্রশ্ন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে—গ্রেফতার হচ্ছে, মাদক উদ্ধার হচ্ছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে: এই দৃশ্যমান তৎপরতা সত্ত্বেও সমস্যার গভীরতা কেন কমছে না? কারণ, আমরা লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত; কিন্তু রোগের উৎস অক্ষত রাখছি। সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবাহ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা—এই তিনটি সমস্যা অটুট থাকলে কিশোর গ্যাং দমন কেবল পরিসংখ্যানের সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।

মনোবিজ্ঞানীদের সতর্কতা

এই ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানীরা যা বলছেন, তা আরো ভয়াবহ। নিয়মিত মাদকসেবনে কিশোরদের আবেগপ্রবণতা লোপ পাচ্ছে, সহানুভূতি কমছে, সহিংসতা তাদের কাছে স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা কেবল অপরাধ বাড়ছে বলে উদ্বিগ্ন নই—আমরা একটি আবেগহীন, বিচ্ছিন্ন, সহিংস মানসিকতার প্রজন্ম গঠনের সাক্ষী হচ্ছি।

করণীয় ও সবার ভূমিকা

এই প্রেক্ষাপটে করণীয় বিষয়গুলি নতুন নয়; কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা কি অস্বীকার করা যায়? যদিও মাদক নিয়ন্ত্রণ সহজ বিষয় নয়। বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশও মাদক নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খায়; কিন্তু তা বলে আমাদের যা করার সুযোগ রয়েছে, তা না-করাটা অপরাধ। আসলে মাদকের ব্যবসা এমনই ব্যবসা, যাতে সংশ্লিষ্টরা অবৈধ অর্থে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। কোনো জনপদ যখন মাদকের সাগরে ভাসে, তখন মাদকের প্রলোভন থেকে কিশোরদের রক্ষা করা সহজ কাজ নয়। অন্যদিকে, যে সমাজ কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, অর্থবহ শিক্ষা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত কিশোর গ্যাং সৃষ্টি করে।

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের ভূমিকা

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। কিশোরদের বিকল্প ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি—এই সকল পদক্ষেপ অপরিহার্য। সর্বোপরি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

উপসংহার

অতএব, কিশোর গ্যাং সমস্যা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ প্রবণতা নয়—এটি আমাদের সময়ের একটি আয়না, যাতে আমরা নিজেদের ব্যর্থতা দেখতে পাই। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের: আমরা কি কেবল এই আয়নায় তাকিয়ে ভয় পাব, নাকি সাহস করে এর ভিতরের বাস্তবতাকে বদলাবার উদ্যোগ গ্রহণ করব?