হামের পরীক্ষার চেয়েও জরুরি আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। আরো বেশি প্রয়োজন সকল শিশুর জন্য ভিটামিন এ নিশ্চিত করা। এখনো সেটি ঠিক মতো হচ্ছে না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, হামে আক্রান্ত হয়ে বাচ্চারা হাসপাতালে আসার পরে ‘ভিটামিন-এ’ ঠিকমতো পাচ্ছে না। এই ভিটামিন এ যদি বস্তি এলাকার সব শিশুদের দেওয়া হতো, তাহলে তারা হামে আক্রান্ত হলেও অনেকটা সুরক্ষা পেত।
আরো সাত শিশুর মৃত্যু
গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়েছে আরো ১২৮১ শিশু। এ নিয়ে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ২৬০ জনে। আর ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরো সাত শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে দুই জনের, আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে পাঁচ জন। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ জনে। আর হামের উপসর্গে মারা গেছে ২৬৮ জন। এতে মোট মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৪ জনে।
এত শিশুর মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক, অভিভাবকসহ দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন হতাশাজনক মন্তব্য। গতকাল মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হসপিটালের বাইরে একজন অভিভাবক নওশের আলী বলেন, “আমার বাচ্চাকে নিয়ে আজ ছয় দিন ধরে হাসপাতালে আছি, বাচ্চা আছে আইসিইউতে। এর আগে অন্য হাসপাতালে অনেক টাকা খরচ হয়েছে, শেষ বেলায় এখানে আসছি, জানি না বাচ্চা সুস্থ হবে কি না।” হামের পরে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত বাচ্চা, তার বয়স ১১ মাস চলে বলে জানান।
‘কিটের সংকট না, স্বল্পতা আছে’
এদিকে হাম পরীক্ষার কিটের সংকট নিয়ে বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মো. মোমিনুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, “এটা কিটের কোনো সংকট না, এটা একটা চলমান প্রসেস। সাপ্লাই পাচ্ছি, ব্যবহার হচ্ছে, কমে যাচ্ছে। অন্যরা না বুঝেই সংকটের কথা লিখছে।” তিনি বলেন, “কিটের সংকট না, স্বল্পতা আছে। স্বল্পতা আর সংকট তো এক কথা নয়। এই কিট বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। এখন যা আছে তা পর্যাপ্ত, আগামী কাল বা পরশুদিন আরো ৩০টা আসবে, আবার সামনের সপ্তাহে আসবে ১০০ টার মতো কিট। আমাদের টেস্ট বন্ধ হচ্ছে না, টেস্ট চলছে। একটা কিট দিয়ে ৯০টা নমুনা পরীক্ষা করা হয়, প্রতিদিন আমরা ৭০০ থেকে ৮০০ নমুনা পরীক্ষা করতে পারি। এখন একটু কম পরীক্ষা হচ্ছে।”
‘কিটের চেয়ে জরুরি টিকা আনা’
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, “কিটের সংকট বা স্বল্পতার কারণে হামের চিকিৎসার কোনো সমস্যা হবে না। হাম হলে—দেখা যাবে, নিউমোনিয়া হলে, তার চিকিৎসা দিতে হবে, ডায়রিয়া হলে তার চিকিৎসা দিতে হবে। কিটের চেয়ে জরুরি টিকা আনা। আজকে টিকা আসা শুরু করেছে। এটা আরো আগে আসা উচিত ছিল। যেহেতু আমরা হামের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করিনি, সেকারণে টিকা কার্গো বিমানে করে আসছে, রুটিন টিকার মতো করে। টিকা দরকার কিন্তু কিটের জন্যে বাচ্চা মারা যাচ্ছে এটা বলা যাবে না।”
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “হাম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা দিলে জটিলতা কম হবে। নিউমোনিয়া হলেও বাচ্চা মারা যাবে না। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠা কঠিন হয়ে যায়। যত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায় তত বাচ্চা দ্রুত সেরে ওঠে।” তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, “মাছ-মাংস খাওয়াতে না পারলেও বাচ্চাকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল একটা খাওয়ান। তাহলে আর আইসিইউতে যেতে লাইন ধরতে হবে না। যারা সুস্থ আছে কিন্তু পুষ্টি নাই, তাদের ভিটামিন এ দেওয়া উচিত। তারা যেন নিউমোনিয়া পর্যন্ত না যায়।”
হামের ১৫ লাখ টিকা এলো দেশে
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টিকার চালান গ্রহণ করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ইউনিসেফ ও গাভির মাধ্যমে হামের ১৫ লাখ এবং টিটেনাস-ডিপথেরিয়ার (টিডি) ৯ লাখ ভ্যাকসিন দেশে এসেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে এসব ভ্যাকসিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ইপিআই কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমান সরকার এটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে ভ্যাকসিন ক্রয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরাসরি ইউনিসেফের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।” মন্ত্রী আরো জানান, আগামী ১০ মের মধ্যে আরো প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন দেশে পৌঁছাবে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুরো সরবরাহ সম্পন্ন হবে বলে পরিকল্পনা রয়েছে। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “৫ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৬৮ লাখের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৩ শতাংশ। শিগগির শতভাগ কভারেজ অর্জন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।”



