মা দিবসে মায়ের জন্য নানা উপহারের কথা ভাবেন সন্তানেরা। এবার মায়ের সুস্থতার খোঁজ নেওয়াও হতে পারে সেরা উপহার। মা দিবসের উপহার হতে পারে, যেসব কথা বা সমস্যা মা কখনোই বলেননি, সেগুলো জানতে চাওয়া; মাকে একবার চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া; একটি রুটিন চেকআপের ব্যবস্থা করা।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ
চল্লিশের পর থেকে বাড়তে থাকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি। বাড়ির অন্যদের রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের ওষুধ খাইয়ে দেন মা, কিন্তু নিজের শর্করা বা রক্তচাপ কখনোই মাপা হয় না। বছরে অন্তত একবার খালি পেটে ও গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর রক্তের শর্করা মাপা উচিত। তা সম্ভব না হলে রক্তের গড় শর্করা এইচবিএওয়ানসি দেখেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। রক্তচাপ মাপা সহজ। এর সঙ্গে রক্তের লিপিড প্রোফাইলও দরকারি। এ বছর এখনো মাপা না হলে মা দিবস উপলক্ষেই পরিকল্পনা করুন। মনে রাখবেন, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বৈকল্যের উৎস এই ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও রক্তে চর্বির আধিক্য।
রক্তশূন্যতা
আমাদের দেশে নারীদের রক্তশূন্যতা খুবই পরিচিত সমস্যা। মায়েরা অন্যের পুষ্টির দিকে যতটা যত্নবান, নিজের প্রতি ততটা নন। তাজা ফলমূল, শাকসবজি তাঁদের বেশি খাওয়া হয় না। রক্তশূন্যতা আছে কি না, দেখতে রক্তের সিবিসি করতে হয়। হিমোগ্লোবিন কম থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল আয়রনের অভাবেই নয়, ফলিক অ্যাসিড বা ভিটামিন বি১২-এর অভাবেও রক্তশূন্যতা হয়। রক্তশূন্যতা হলে ক্লান্তি, অবসাদ, মাথা ঝিমঝিম, ফ্যাকাশে ভাব, মুখে ঘা হতে পারে। তাই মায়েদের রক্তের সিবিসি ও দরকার পড়লে আয়রন প্রোফাইল করা উচিত।
থাইরয়েড
নারীদের, বিশেষ করে মধ্যবয়সী নারীদের থাইরয়েডজনিত সমস্যা খুবই সাধারণ। হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি বেশি দেখা যায়। এতে ক্লান্তি, অবসাদ, ঘুম ঘুম ভাব, ওজন বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য, শুষ্ক ত্বক, চুল পড়া হয়। উপসর্গ না থাকলেও থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা নারীদের জন্য রুটিন পরীক্ষা। তাই এ সুযোগে রক্তের টিএসএইচ ও ফ্রি টিফোর পরীক্ষা করুন।
ভিটামিন ডি
বাংলাদেশে নারীদের ভিটামিন ডির অভাব প্রকট, বিশেষ করে যাঁরা বাড়ির বাইরে রোদে বের হন না। ভিটামিন ডির অভাবে ক্লান্তি, পেশিতে কামড়ানো, ব্যথা হয়। হাড়ক্ষয়ের অন্যতম কারণ ভিটামিন ডির ঘাটতি। মেনোপজের পর অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। এ সময় ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দরকার হতে পারে। কতটুকু লাগবে, তা নির্ধারণে রক্তে ভিটামিন ডির মাত্রা দেখুন।
ফ্যাটি লিভার
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ে। ওজন বেশি, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি বা ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি আরও বেশি। ফ্যাটি লিভার হলে রক্তের এসজিপিটি বাড়ে। পেটের আলট্রাসনোগ্রামে লিভারে চর্বি ধরা পড়ে। দরকার পড়লে ফাইব্রোস্ক্যান করতে হতে পারে। চিকিৎসা হলো খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ পরিবর্তন, ওজন কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম। চিকিৎসা না করলে লিভার সিরোসিস হতে পারে। তাই এ বয়সে আলট্রাসনোগ্রাম জরুরি।
স্তন ক্যানসারের পরীক্ষা
মায়েরা স্তন ও জরায়ু ডিম্বাশয়ের সমস্যা সবচেয়ে বেশি অবহেলা করেন। বাংলাদেশে বেশির ভাগ স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে দেরিতে। অথচ সঠিক সময়ে শনাক্ত করলে সম্পূর্ণ সেরে ওঠা সম্ভব। বছরে অন্তত একবার স্তনের আলট্রাসনোগ্রাফি করা উচিত। প্রয়োজনে ম্যামোগ্রাম। দক্ষ চিকিৎসকের কাছে স্তন পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। মায়েরা এ বিষয়ে দ্বিধায় ভোগেন। সন্তানেরাই সংকোচ ভেঙে মাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেন।
জরায়ুর পরীক্ষা
তলপেটের আলট্রাসনোগ্রাম করলে জরায়ু বা ওভারির সমস্যা ধরা পড়ে। মেনোপজের পর মাসিকের মতো রক্তপাত সন্দেহজনক। তলপেটে ব্যথা, ভারী বোধ, চাকা বোধ করা খারাপ উপসর্গ। উপসর্গ না থাকলেও একটি বয়সের পর আলট্রাসনোগ্রাম ও জরায়ুমুখের রস পরীক্ষা করা উচিত। এতে অনেক রোগ আগেভাগেই ধরা পড়ে।
প্রস্রাবে সংক্রমণ
মায়ের বয়সী নারীদের প্রস্রাবে সংক্রমণ খুবই পরিচিত সমস্যা। প্রস্রাবে জ্বালা, তলপেটে ব্যথা, অস্বস্তি, জ্বর জ্বর ভাব হতে পারে। প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষায় বিশেষ কোষ বেশি পাওয়া গেলে কালচার করতে হয়। সে অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে রেহাই মেলে। প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষায় আমিষ, সুগার ইত্যাদিও জানা যায়।
হাড়ের ঘনত্ব
বয়স্ক নারীদের অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয় বড় সমস্যা। বোন মিনারেল ডেনসিটি বা ডেক্সা স্ক্যান দিয়ে হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপ করা যায়। কম থাকলে চিকিৎসা আছে, যা হাড় ভেঙে যাওয়া প্রতিরোধ করে। মায়ের বয়স বেশি হলে বাথরুমে চলাচলে সাবধানতা জরুরি। বাথরুম শুকনো রাখা ও দেয়ালে ধরার ব্যবস্থা রাখা দরকার।
হার্টের সুস্থতা
বয়স বাড়লে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। মেনোপজের পর নারীদের ঝুঁকি পুরুষের সমান হয়। বুকে চাপ, ব্যথা, পরিশ্রমে ব্যথা বাড়া, কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়া হার্টের রোগের লক্ষণ। তবে পূর্বলক্ষণ ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। ইসিজি বা ইকোকার্ডিওগ্রাফি রুটিন পরীক্ষা, কিন্তু সব সময় ধরা নাও পড়তে পারে। ইটিটি করলে সম্ভাব্য রোগ আঁচ করা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে মায়ের হার্ট পরীক্ষা করিয়ে নিন।



