সিলেটে সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে সিলেট সিটি করপোরেশন প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই সমাবেশে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে শহরের মানুষ কিছুটা চিকিৎসা সুবিধা পেলেও গ্রামের অধিকাংশ এলাকায় এখনো স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায়নি।
স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই ১ লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এই মানুষগুলোর দায়িত্ব হবে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবে। তবে আমরা জোর দেব, গ্রামের মানুষের ওপরে বেশি। তারা বিশেষ করে পরিবারের নারীদের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা চালাবে।'
তিনি আরও বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবারের নারীদের সচেতন করবে যে কোন খাবারটি খেলে ডায়াবেটিস হবে না, কোন খাবারটি খেলে কার্ডিও হবে না, বা লাইফস্টাইল কী হলে হার্টের সমস্যা হবে না, কোন খাবারটি খেলে কিডনির রোগ হবে বা হবে না—এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করবে। হাইজিন সম্পর্কে তাদের সংশোধন করবে।
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা চাচ্ছি ধীরে ধীরে সামগ্রিকভাবে পুরা দেশে অসুস্থ যত বেশি সংখ্যক মানুষকে সুস্থ রাখা। তার ফলে স্বাভাবিকভাবে যাঁরা হাসপাতালে আসবে, পরবর্তী সময়ে অসুস্থ হয়ে তাঁদের যাতে বেটার চিকিৎসা দেওয়া যায়। অসুস্থ মানুষের সংখ্যা যখন কম হবে, আমাদের জন্য সুবিধা হবে টেককেয়ার করতে। আমরা যদি মানুষকে সচেতন করতে পারি, সচেতনতার মাধ্যমে আমরা যদি অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি, তাহলে যাঁরা অসুস্থ হবেন তাঁরা বেটার সার্ভিস পাবেন।'
জলাবদ্ধতা ও খাল খনন
সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যার বিষয়টি উত্থাপন করে তা সমাধানে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, 'আজ বৃষ্টি হচ্ছে। কারও জন্য সুবিধা, কারও জন্য অসুবিধা। এই বৃষ্টির কারণে আমি যখন শহরের দিকে আসছি, বৃষ্টির কারণে দেখেছি বিভিন্ন জায়গায় একটু একটু করে পানি জমে গিয়েছে এবং বৃষ্টি যদি আরেকটু বেশি হয়, হয়তো এরই ভেতরে অনেক জায়গা আছে, যেখানে কিছু জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে যাবে। তবে কিছুদিন আগে আপনারা দেখেছিলেন, চট্টগ্রামের কিছু নিউজ এসেছিল। যদিও সেটার মধ্যে পরে আমরা দেখেছি, পুরোপুরি সত্যতা ছিল না। যাই হোক, আমরা দেখেছি যে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা।'
সিলেট নগরের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল যেটা আছে, সেটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সকল কিছু বিষয় মাথার মধ্যে রেখে বিবেচনা করে আমরা খাল খনন কর্মসূচি সারা দেশে দিয়েছি। আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল যেটা আছে, সেটা শুধু সিলেট সিটি করপোরেশন নয়, এই সমস্যা ঢাকাতে আছে, এই সমস্যা অন্য অনেক শহরগুলোতে আছে। আমাদের জন্য যেটি একটি বড় সমস্যা হচ্ছে। যেভাবে আমরা মাটির নিচে যে পানি আছে, এটিকে যে টেনে তুলছি, এ ছাড়া কৃষিকার্যের জন্য একই কাজ আমরা করছি, এটি ধীরে ধীরে একটি ভয়াবহ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।'
জলাবদ্ধতা দূরসহ নানা কারণে খাল খননের প্রাসঙ্গিকতা আছে উল্লেখ করে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, 'পানিটাকে যাতে আমরা ব্যবহার করতে পারি, জলাবদ্ধতাও যাতে না হয়, মানুষেরও কষ্ট না হয়, সেটি কৃষির সুবিধার জন্য হোক, পানি থেকে মানুষের ব্যবহার সুবিধার জন্যই হোক, আমরা খালগুলো খনন করতে চাচ্ছি দেশে, যাতে অতিরিক্ত যে পানি থাকবে, সে পানিটাকে যাতে আমরা ধরে রাখতে পারি এবং প্রয়োজনের সময় আমরা সেটিকে মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারি।'
সুরমা নদীর তীরে প্রকল্প
এর আগে সকালে ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে করে সিলেটে আসেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সাড়ে ১০টার দিকে তিনি নগরের দরগাগেট এলাকায় হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। পরে ১০টা ৫৫ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউস-সংলগ্ন সুরমা নদীর পাড়ের চাঁদনিঘাট এলাকায় সুরমা নদীর উভয় পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যাপ্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেন। এরপর নগর ভবন প্রাঙ্গণে সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
সুধী সমাবেশে অন্যান্য বক্তা
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিলেট সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা সুনন্দা রায়। অনুষ্ঠানে দর্শক সারিতে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানসহ সিলেটের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজসহ নানা শ্রেণি-পেশার কয়েক শ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য কর্মসূচি
পরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া খালের উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুপুর ১২টায় বাসিয়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে তিনি সিলেট সার্কিট হাউসে বিশ্রাম নেবেন। বেলা তিনটায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিশু ও কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস' কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন তিনি। বিকেল পাঁচটায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় সভায় যোগ দিয়ে সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।



