দেশে হামের প্রকোপ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। অনেক শিশু চিকিৎসায় হাম থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এতে অভিভাবকদের উদ্বেগও বাড়ছে।
হাসপাতালে শয্যা সংকট ও জটিলতা
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও অনেক শিশুর নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে। ফলে চিকিৎসা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং খরচও বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটও প্রকট আকার ধারণ করছে। শিশু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে অ্যাডিনোভাইরাস সংক্রমণের কারণে নিউমোনিয়া শনাক্ত হচ্ছে। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নেই, পাশাপাশি সহজলভ্য কোনো টিকাও নেই। ফলে শিশুদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, জ্বর, কাশি বা হামের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুদের আলাদা রাখতে হবে।
ঢাকার হাসপাতালের চিত্র
গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে ১০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সেখানে ৪০৫ জন চিকিৎসাধীন। একই সময়ে একশোর বেশি রোগী ছাড়পত্র পেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কার্যক্রম চললেও এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে আরও দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং একজন মারা গেছেন। বর্তমানে সেখানে ৭৫ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন। রোগীর সংখ্যা বাড়ায় করিডোর, সিঁড়ি ও লিফটের সামনেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রোগীদের দুর্ভোগ
সাত মাস বয়সী শিশু সোহানকে হাসপাতালের সিঁড়িতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। তার মা জানান, প্রথমে শেরপুরে চিকিৎসা নিয়ে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ে। পরে হাম শনাক্ত হয়। একাধিক হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার হামের লক্ষণ কমলেও এখনও নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও জ্বরে ভুগছে।
একইভাবে কুমিল্লার ছয় মাস বয়সী নসিফকে স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর বাড়িতে অবস্থা খারাপ হলে ঢাকায় আনা হয়। পরে তার হাম শনাক্ত হয় এবং এখন নিউমোনিয়ায় ভুগছে। শ্বাসকষ্টের কারণে তাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতামত
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এফ এ আসমা খানম বলেন, 'মানবিক কারণে আমরা করিডোর ও সিঁড়িতেও রোগী ভর্তি করছি। বেশিরভাগ শিশুর হাম সেরে গেলেও পরে নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়।'
ডিএনসিসি হাসপাতালের ডা. আসিফ হায়দার বলেন, 'টিকা নেওয়ার পরও সতর্কতা জরুরি। জ্বর, কাশি বা হামের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুদের আলাদা রাখতে হবে, কারণ অন্য শিশুরাও সংক্রমিত হতে পারে।' তিনি বিচ্ছিন্নতার ওপর জোর দেন।
একটি শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, জটিল নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। গুরুতর ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর প্রয়োজন হয়, যা চিকিৎসার খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়। 'এ ধরনের খরচ অনেক পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য, যা উদ্বেগজনক,' তিনি যোগ করেন।
সরকারি তথ্য
শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টার মধ্যে হামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং হামের মতো উপসর্গে আরও সাতজন মারা গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে ১ হাজার ৪২১ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৪৩ জন নিশ্চিত। ১৫ মার্চ থেকে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৩২ হাজার ২৮ জনে পৌঁছেছে। সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা ২১৬, যার মধ্যে ৪৩ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঢাকা বিভাগে, তারপর রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে।



