বাংলাদেশে হামের উচ্চ ঝুঁকি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' বলে মূল্যায়ন করেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, বিপুল সংখ্যক শিশু আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনার ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই মূল্যায়ন করা হয়।
সংক্রমণের বিস্তার
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) ফোকাল পয়েন্ট ডব্লিউএইচও-কে জানায়, দেশে হাম রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে এই বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী ২ হাজার ৮৯৭ জন। তবে বিস্তারিত বিবরণে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৩ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের। মৃত্যুহার (সিএফআর) ০.৯ শতাংশ, যেখানে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু ৩০ জনের, মৃত্যুহার ১.১ শতাংশ। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন, যার মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ৯ হাজার ৭৭২ জন।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত
সবচেয়ে বেশি হামের চাপ দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে। ১৫ মার্চ থেকে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে ৮ হাজার ২৬৩, রাজশাহী বিভাগে ৩ হাজার ৭৪৭, চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ৫১৪ এবং খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৫৬৮ জন। ঢাকায় ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে, যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও বস্তি এলাকা।
দেশের আট বিভাগেই রোগী শনাক্ত হয়েছে। ৬৪ জেলার ৫৮টিতে, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ জেলায় রোগী পাওয়া গেছে, যা জাতীয়ভাবে ব্যাপক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়েছে এবং আক্রান্ত শিশুদের ৮৩ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে।
শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
ডব্লিউএইচও-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সি ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী ৩৩ শতাংশ। ১৬৬ জন সন্দেহভাজন মৃত্যুর মধ্যে অধিকাংশই টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সি শিশু।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের একটি বড় উদ্বেগ হলো, অনেক শিশু হয় টিকা পায়নি, নয়তো হামপ্রতিরোধী টিকার মাত্র এক ডোজ পেয়েছে। কিছু শিশু ৯ মাস বয়সে টিকার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগী (৯১ শতাংশ) ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা এই বয়সি শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
হামের সংক্রমণ ও জটিলতা
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক তীব্র ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির নাক, মুখ বা গলা থেকে বের হওয়া ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রাথমিক উপসর্গ দেখা যায়, যেমন উচ্চ জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা প্রথমে মাথায় শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত রোগী অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে। হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই; বেশির ভাগ মানুষ দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে হাম গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে, যেমন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), অন্ধত্ব ও মৃত্যু। প্রতি এক হাজার রিপোর্ট হওয়া রোগীর মধ্যে প্রায় একজনের এনসেফালাইটিস এবং দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু (বিশেষ করে ভিটামিন এ ঘাটতি) এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত।
টিকাদানে ঘাটতি ও আগের অগ্রগতিতে ধাক্কা
এই প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালে ৮৯ শতাংশ থেকে ২০১৬ সালে ১১৮ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজ ২০১২ সালে ২২ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১২১ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকায় কভারেজ কমে যায়। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বেড়ে বর্তমান প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকি 'উচ্চ' হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, কারণ একাধিক বিভাগে সংক্রমণ চলমান, বিপুল সংখ্যক শিশু ঝুঁকিতে, রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি নথিভুক্ত এবং হাম-সম্পর্কিত সন্দেহভাজন মৃত্যু ঘটেছে। টিকা না পাওয়া ও আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগীর সংখ্যা বেশি, যা অব্যাহত সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
টিকাদান অভিযান শুরু
জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (এনআইটিএজি) ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি অনুমোদন করে, যার লক্ষ্য ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশু। ৫ এপ্রিল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল; চলমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত সব হাম রোগীকে ভিটামিন এ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পর্যায়ের দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (আরআরটি) সক্রিয় করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে। অন্যান্য ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে নিয়মিত টিকাদান জোরদার, হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো, ভিটামিন এ সরবরাহ নিশ্চিত করা, রোগী আলাদা রাখার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা। দেশজুড়ে নজরদারি ও রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জোরদারের কাজ চলছে এবং সাপ্তাহিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়ানোর ঝুঁকি
ডব্লিউএইচও বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচলের কারণে সংক্রমণ ছড়ানোর উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি আছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় নগরকেন্দ্র আন্তর্জাতিক যাতায়াতের কেন্দ্র, যা দেশের ভেতরে ও বাইরে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হাম স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান এবং আঞ্চলিক ঝুঁকি 'উচ্চ'।
বাংলাদেশের ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। মিয়ানমারে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য এবং চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে নজরদারি সীমিত। ভারত উচ্চ টিকাদান কভারেজ অর্জন করলেও গত ছয় মাসে সেখানে হাম রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো শহর ভারতের সঙ্গে ব্যস্ত স্থলবন্দর ভাগ করে, যা সীমান্তের ওপার থেকে সংক্রমণ প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব পর্যায়ে ঝুঁকি 'মধ্যম' হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ
ডব্লিউএইচও সব পৌর এলাকায় হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে হাম ও রুবেলা সংক্রমণের ওপর নজরদারি জোরদার করতে বলেছে, যাতে সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সব সন্দেহভাজন রোগী দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
উচ্চ যাতায়াতপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার এবং বিদেশ থেকে আসা হাম রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাম মোকাবিলায় জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে এবং হাসপাতালে যথাযথ রোগী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকাতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যটন ও পরিবহন খাতে কর্মরত ব্যক্তি, হোটেল, বিমানবন্দর, সীমান্ত পারাপার, গণপরিবহন–সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী অন্তর্ভুক্ত। উচ্চ যাতায়াতপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সংক্রমণের সংস্পর্শে আসা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের তিন দিনের মধ্যে হামপ্রতিরোধী টিকা দেওয়া উচিত। যাদের টিকা দেওয়া যায় না, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ছয় দিনের মধ্যে বিশেষ ইনজেকশন দেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। শিশু, গর্ভবতী নারী এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ডব্লিউএইচও টিকা, সিরিঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।



