হাম শনাক্তকরণে কিট সংকট: জনস্বাস্থ্য বিপদের মুখে
দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় রোগ শনাক্তকরণ বা ডায়াগনসিস হচ্ছে প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু বর্তমানে হামের পরিস্থিতি যখন আশঙ্কাজনক মোড় নিয়েছে, তখন পর্যাপ্ত কিটের অভাবে এই প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সারা দেশ থেকে কয়েক শ নমুনা সংগ্রহ করা হলেও কিট সংকটের কারণে অর্ধেকের বেশি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে কিট
শাহজালাল বিমানবন্দরে হাম শনাক্তকরণের কিট এসে পড়ে থাকলেও তা আমলাতান্ত্রিক বা ‘কাগজপত্রের জটিলতায়’ আটকে আছে, এটি খুবই হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক চিত্র। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ) দেশের একমাত্র ল্যাবরেটরি, যেখানে হামের পরীক্ষা হয়। অথচ কয়েক গুণ বেশি সক্ষমতা থাকলেও সেখানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১২০টির মতো নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, যা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম।
কিটের জন্য আমাদের পুরোপুরি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে—এটি একটি স্বাধীন দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য যেমন লজ্জাজনক, তেমনি ভয়াবহ উদ্বেগেরও বিষয়। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৬৬ শতাংশের ওপরে, অর্থাৎ যাঁরা পরীক্ষা করাতে পারছেন, তাঁদের বড় অংশই আক্রান্ত।
শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির শঙ্কা
হাম শনাক্তের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়ালেও উপসর্গ থাকা রোগীর সংখ্যা ২৩ হাজার অতিক্রম করেছে। এমনকি সরকারি হিসাবেই ১৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষা যদি পর্যাপ্ত হতো, তবে আক্রান্ত শনাক্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা আরও বাড়ত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জনস্বাস্থ্যবিদদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়াটা চরম অবহেলা ও আন্তরিকতার ঘাটতিরই নামান্তর।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে কিটের বিষয়টি একটি জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কেন গুরুত্ব দিয়ে ভাবল না? কেন কিট সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হলো না? বরগুনা বা ঢাকার শিশু হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নমুনা পাঠিয়েও যখন মাসের পর মাস ফলাফলের অপেক্ষায় থাকে, তখন হামের প্রাদুর্ভাব আরও বেশি বিস্তারের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
টিকাদান ও শনাক্তকরণের সমন্বয় প্রয়োজন
দেশব্যাপী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা অত্যন্ত জরুরি উদ্যোগ। তবে টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। টিকাদান ও শনাক্তকরণ—এ দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। আমরা মনে করি, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাম শনাক্তকরণ ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
আমরা আশা করি, বিমানবন্দরে আটকে থাকা কিটগুলো দ্রুত খালাস করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং শুধু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে কিট আমদানির পরিকল্পনা নেবে। হামের এই প্রকোপ যেন বড় কোনো জাতীয় সংকটে রূপ না নেয়, সে জন্য স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।



