প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও জরুরি ব্যবস্থা
গরমে হিট স্ট্রোক: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও জরুরি ব্যবস্থা

প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও জরুরি ব্যবস্থা

গরমের সময় আমাদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘাম হওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কিন্তু অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঘামার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ঘামের মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কাজটিও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না। এ অবস্থায় দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায়, যা প্রায়ই ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হতে পারে।

হিট স্ট্রোকের বিপদ ও উপসর্গ

তখন মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেখা দেয় নানা ধরনের উপসর্গ। এ অবস্থার নামই হিট স্ট্রোক। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তি এলোমেলো কথা বলতে পারেন। অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। তাঁর খিঁচুনি হতে পারে। শরীর একেবারে ঘামহীন হয়ে যেতে পারে। হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিক ছন্দে স্পন্দিত হতে পারে। লিভার, কিডনি, মাংসপেশিসহ দেহের নানান অংশের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে এর কারণে মৃত্যুও হতে পারে।

হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ

হিট স্ট্রোক হওয়ার আগে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ যখন বাধা পাওয়া শুরু করে, তখনই বেশ কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক সময় এগুলোকে ছোটখাটো সমস্যা ভেবে অবহেলা করা হয়। এই যেমন, মাথাব্যথা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তি। গরমের কারণেই যে মাথাব্যথা হচ্ছে বা অতিরিক্ত ক্লান্তি লাগছে, অনেকেই তা ভেবে দেখেন না। এ ধরনের উপসর্গকে তেমন গুরুত্ব দেন না কিংবা ধরে নেন এর পেছনে ঘুমের ঘাটতি বা অন্য কোনো কারণ আছে। আর এসব উপসর্গ নিয়েই কাজকর্ম চালিয়ে যান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রচণ্ড গরমে শরীর অবসন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। গরমে অনেক সময় বমিভাব হয়। বমিও হয়। মাথা ঘোরায় বা ঝিমঝিম করে। অনেক সময় মনে হয় মাথাটা হালকা হয়ে আসছে। কাজ চালিয়ে গেলেও তখন মনোযোগ থাকে না। অল্পতেই মেজাজ বিগড়ে যেতে থাকে। পেট কামড়াতে পারে। পায়ের পেশিতে টান লাগতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম হয়। শরীর গরম হয়ে ওঠে। ত্বক লালচে দেখায়। হৃৎপিণ্ডের গতি কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাসের গতিও বাড়তে পারে। মুখ ও গলা শুকিয়ে আসে। প্রচণ্ড তৃষ্ণা লাগে। পানিশূন্যতার কারণে এমনটা হয়। তখন প্রস্রাবের রং গাঢ় হতে থাকে। একসময় প্রস্রাবের পরিমাণও কমে যায়।

জরুরি ব্যবস্থা ও প্রতিরোধের উপায়

হিট স্ট্রোক একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা। হিট স্ট্রোকের আগের এসব উপসর্গকে তাই গুরুত্ব দিতে হবে। এসব দেখা গেলে দ্রুততম সময়ে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। কাজে বিরতি দিতে হবে। পানি খেতে হবে। তুলনামূলক ঠান্ডা স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। মুখে, মাথায়, গলায়, ঘাড়ে পানি ছিটিয়ে নিতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া যেতে পারে। বগল, গলা এবং কুঁচকিতে বরফ রাখলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ হয় সহজে। বরফ না পেলে ঠান্ডা পানিতে ভেজা কাপড় রাখতে চেষ্টা করুন। শরীরে বাতাস দিতে হবে। হাতপাখা কিংবা রিচার্জেবল পাখা ব্যবহার করা যেতে পারে। সম্ভব হলে পোশাকের কিছু অংশ সরিয়ে নেওয়া উচিত। কিছু বোতাম খুলে দেওয়া যেতে পারে। আঁটসাঁট করে পিন আটকানো থাকলেও ভেতরে বাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা করা উচিত। অতিরিক্ত ঘাম হলে সামান্য লবণ মেশানো পানীয়, ওরস্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক খাওয়া উচিত। ডাবের পানিও কাজে দেবে সেই সময়।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এবং কমবয়সী শিশুদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে। তাই তাঁদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। তবে কমবয়সী কর্মঠ মানুষ অনেক সময়ই নিজের প্রতি খুব একটা যত্নশীল হন না। গরমে বাইরে কাজ করতে গিয়ে তাঁদেরও হিট স্ট্রোক হতে পারে।

হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে সতর্কতা

হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা যাতে ঠিক থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। পানিশূন্যতা এড়াতে সচেষ্ট থাকুন। আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই জীবনধারা বেছে নিন। পানি খাওয়ার জন্য তৃষ্ণা লাগা পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই। এমনিতেই মাঝেমধ্যে একটু করে পানি খেয়ে নিন। তবে গরমে চা-কফি কম খাবেন। বাইরে গেলে সঙ্গে পানি ও ছাতা রাখুন। ছোট পাখাও রাখতে পারেন। মাঝেমধ্যে মুখে পানি ছিটিয়ে নেওয়া এবং ভেজা কাপড় দিয়ে মুখ আর শরীর মোছা ভালো। পানি বহনের জন্য প্লাস্টিকের বোতল নয়, থার্মোফ্লাস্ক বেছে নিন। এতে পানি ঠান্ডা এবং নিরাপদ থাকবে। পানির বোতলে পানি ভরার আগে কয়েক টুকরা বরফ রেখে নিলে ওই পানি লম্বা সময় পর্যন্ত ঠান্ডা থাকে। গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলুন। এমন খাবার খাবেন, যাতে অনেকটা পানি আছে। রসালো ফল বেছে নিন। এমন সবজি খান, যেটির ভেতরটা সাদা। ঝোলজাতীয় পদ খান। পাতলা ডাল খাওয়া ভালো। হালকা রঙের এমন পোশাক পরুন, যার ভেতর দিয়ে বাতাস যায়। রোদ ও উত্তপ্ত বাতাস থেকে বাঁচতে ফুলহাতা জামা ও ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরা ভালো। প্রচণ্ড রোদের সময় ঘরে থাকতে চেষ্টা করুন। প্রয়োজন ছাড়া ওই সময় বাইরে যাবেন না। ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো। শরীরচর্চার জন্য এমন সময় নির্ধারণ করুন, যখন তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে।

সামাজিক দায়িত্ব ও পরিবেশ সুরক্ষা

তীব্র আবহাওয়ায় শুধু নিজের না, পরিবারের সবার প্রতি খেয়াল রাখুন। শিশুরা যেন স্কুলে গিয়ে রোদে দৌড়ঝাঁপ না করে। কারও পানি খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলে চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন, গরমের সময় তিনি কতটা পানি খেতে পারবেন। রিকশাচালক রোদে ঘাম ঝরান, গাড়িচালক গরম হয়ে ওঠা গাড়িতে বসে থাকেন। ফেরিওয়ালারা রোদে রোদে পণ্য নিয়ে ঘুরতে থাকেন। নিজ এলাকায় এমন মানুষদের জন্য খাওয়ার পানি এবং হাত-মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে পারেন। পথের প্রাণীদের জন্যও পানির ব্যবস্থা করুন। বারান্দা ও ছাদে পাখিদের জন্য পানি রাখতে পারেন। আপনার বাড়ির ছায়ায় নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিক অসহায় কোনো প্রাণ। পানির পাত্রগুলো পরিষ্কার করে তাতে নতুন করে পানি দেবেন রোজ। একটানা কয়েক দিন পানি জমে থাকতে দেবেন না। যেখানেই সুযোগ পান, গাছ লাগান। চারপাশে রাখা পানির উৎস এবং গাছের কারণে পরিবেশের তাপমাত্রা কিছুটা হলেও কমবে। হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে বাঁচবেন আপনি, আপনার প্রিয়জন।