অটিজম শনাক্তকরণে ত্রুটি: শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে
অটিজম শনাক্তকরণে ত্রুটি: শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

অটিজম শনাক্তকরণে পদ্ধতিগত দুর্বলতা: শিশুদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে

শিশুদের কথা না বলা বা দেরিতে কথা শেখা মানেই যে অটিজম, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার কোনো রোগ নয়; বরং এটি মস্তিষ্কের বিকাশের একটি বিশেষ অবস্থা। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে সামাজিক সচেতনতা গত এক দশকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও, মাঠপর্যায়ে এর সঠিক শনাক্তকরণ ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুতর পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। একজন মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই সমস্যা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী নির্ধারণের জন্য যে তাড়াহুড়া ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তা শিশুদের অধিকার ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উভয়ের জন্যই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশিক্ষণের অভাব ও দ্রুত সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি

বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণের মূল দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত। তবে কঠোর বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ চিকিৎসা কর্মকর্তার অটিজম বা নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বিষয়ে বিশেষায়িত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। এমবিবিএস কারিকুলামে বিষয়টি অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে পড়ানো হয়, যা দিয়ে একটি শিশুর জটিল আচরণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তাকে সঠিকভাবে অটিস্টিক হিসেবে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। যখন ভাতাভোগী নির্বাচনের সময় শত শত আবেদনকারী ভিড় করেন, তখন মাত্র কয়েক মিনিটের সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা বা অভিভাবকের বর্ণনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই তড়িঘড়ি সংস্কৃতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অশনিসংকেত। কারণ, অটিজম এমন কোনো বিষয় নয় যা স্টেথোস্কোপ বা রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ এবং শিশুর সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতার নিবিড় মূল্যায়ন। প্রশিক্ষণহীন অবস্থায় এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা অনেক সময় ভুল ডায়াগনসিসের দিকে ঠেলে দেয়, যা শিশুদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৈজ্ঞানিক টুলের অভাব ও ভুল শনাক্তকরণের পরিণতি

যেকোনো বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি আদর্শ টুল বা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থাকা অত্যাবশ্যক। উন্নত বিশ্বে অটিজম শনাক্তকরণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও, বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে আজও এমন কোনো সহজবোধ্য ও বৈজ্ঞানিক জাতীয় মান ডায়াগনস্টিক টুল বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এই টুলের অভাবে তৃণমূলের একজন সাধারণ চিকিৎসক সঠিকভাবে অটিজম শনাক্ত করতে পারেন না। একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা টুলের অভাবে একেক চিকিৎসক একেক মানদণ্ডে অটিজম নির্ধারণ করছেন, যা মারাত্মক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। এর ফলে যা ঘটছে তা হলো—কোনো শিশু হয়তো কেবল শ্রবণপ্রতিবন্ধী বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী, তাকে অটিজম কার্ড দেওয়া হচ্ছে। আবার প্রকৃত অটিজম আক্রান্ত শিশু সঠিক যাচাইয়ের অভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত অটিজম আক্রান্ত শিশুর সঠিক পরিসংখ্যান যেমন মিলছে না, তেমনি তারা প্রয়োজনীয় থেরাপি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুল তথ্যের প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে বাধা

এই ভুল ডায়াগনসিসের প্রভাব শুধু ব্যক্তির ওপরই নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও সুদূরপ্রসারী। আমাদের জাতীয় তথ্য বাতায়ন বা ডিজঅ্যাবিলিটি ইনফরমেশন সিস্টেমে যে তথ্যগুলো জমা হচ্ছে, তার সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠার অবকাশ রয়েছে। যখন ডেটাবেজে ভুল তথ্য প্রবেশ করে, তখন সরকারের পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জনস্বাস্থ্য নীতিমালা তৈরি হলে, প্রকৃত সমস্যা আড়ালেই থেকে যায়। এতে রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় ঘটে এবং যারা প্রকৃত সেবা পাওয়ার যোগ্য, তারা মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হয়। এই বিভ্রান্তি দূর করা না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

সমাধানের পথ: প্রশিক্ষণ, টিমওয়ার্ক ও ডিজিটাল মনিটরিং

অটিজম নিয়ে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার। উপজেলা পর্যায়ের প্রত্যেক চিকিৎসা কর্মকর্তাকে অন্তত স্বল্পমেয়াদি নিবিড় প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে, যাতে তাঁরা ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অটিজমের প্রাথমিক লক্ষণগুলো নির্ভুলভাবে চিনতে পারেন। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত একটি স্ক্রিনিং টুল তৃণমূল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু একজন চিকিৎসকের ওপর ভার না দিয়ে একজন সমাজসেবা কর্মকর্তা, একজন ফিজিওথেরাপিস্ট বা সাইকোলজিস্টের সমন্বয়ে একটি বহুশাস্ত্রীয় টিম গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে ভাতাভোগী নির্ধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ও কক্ষ বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যায়। ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উপজেলা থেকে পাঠানো ডেটাগুলো জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দ্বারা মাঝেমধ্যে যাচাই করার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

শেষ কথা: সঠিক শনাক্তকরণই প্রথম সোপান

অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি কেবল সহানুভূতি দেখানোই যথেষ্ট নয়, তাঁদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। আর এই অধিকারের প্রথম ধাপ হলো সঠিক শনাক্তকরণ। দায়সারা গোছের ডায়াগনসিস দিয়ে আমরা শুধু একটি ভুল পরিসংখ্যানই তৈরি করছি না; বরং হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছি। মাঠপর্যায়ের কাঠামোগত ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে, কারণ সঠিক রোগ নির্ণয়ই হলো সঠিক সেবার প্রথম ও প্রধান সোপান। শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এই সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।