অর্ধযুগ ধরে অন্ধকার ঘরে শিকলবন্দি মামুন, ছেড়ে গেছেন স্ত্রীও
অর্ধযুগ ধরে অন্ধকার ঘরে শিকলবন্দি মামুন, ছেড়ে গেছেন স্ত্রী

চারপাশের মানুষ যখন স্বাভাবিক জীবনে ব্যস্ত, মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মাকে নিয়ে সুখের সংসার করছেন- তখন অন্ধকার ঘরের কোণে পায়ে লোহার শিকল আর তালাবদ্ধ অবস্থায় দিন কাটছে মামুনের। তাকে ছেড়ে চলে গেছেন স্ত্রীও। সঙ্গে নিয়ে গেছেন সন্তানদের।

ছয় বছরের বন্দি জীবন

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার জিরুয়া গ্রামের দিনমজর মো. হানিফ মিয়ার বড় ছেলে ৩৮ বছরের যুবক আবুল হোসেন মামুনের এভাবেই কেটে গেছে দীর্ঘ ছয়টি বছর। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে অর্ধযুগ ধরে তাকে এভাবেই বন্দি করে রেখেছে তার অসহায় পরিবার। ৪ ভাই ১ বোনের মধ্যে সে সবার বড়।

স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা

স্থানীয় লোকজন জানান, মামুন আর ১০টা সাধারণ ছেলের মতোই মেধাবী ও চঞ্চল ছিলেন। বিয়ে করে সংসারও করেছেন, হয়েছেন ২ সন্তানের জনক। এর মধ্যে মামুনের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে দুই সন্তানকে নিয়ে স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে অন্যত্র সংসার করছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে হঠাৎ করেই তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। কোনো কারণ ছাড়াই হিংস্র হয়ে ওঠা, ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করা এবং মানুষকে আঘাত করার প্রবণতা তৈরি হয় তার মধ্যে। প্রথমদিকে পরিবার সাধ্যমতো কবিরাজি ও প্রাথমিক চিকিৎসা করালেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। একপর্যায়ে মামুন বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং প্রতিবেশীদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ানোয়, বাধ্য হয়ে তার পায়ে শিকল পরিয়ে দেয় পরিবার।

অভাবের সংসারে চিকিৎসা অলীক স্বপ্ন

মামুনের বাবা একজন দিনমজুর। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে ছেলের উন্নত মানসিক চিকিৎসা করানো এক অলীক স্বপ্ন। টিনের চালের এক কোণায় কাটে মামুনের দিন-রাত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মা রেশমা আক্তার কহিনুর বলেন, 'কোনো মা-বাপ চায় নিজের কলিজার টুকরারে এভাবে শিকল দিয়া বাইন্ধা রাখতে? আমার বুকটা ফাইটা যায়; কিন্তু ছাইড়া দিলে ও মানুষের ক্ষতি করে, বাহিরে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। আমাদের তো ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য নাই। আল্লায় যদি ওরে নিয়া যাইত, তাও এই কষ্ট দেখতাম না।'

বাবা হানিফ মিয়া বলেন, মামুনকে যদি কোনো ভালো মানসিক হাসপাতালে নিয়ে সুচিকিৎসা দেওয়া হতো, তবে হয়তো সে আবার সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারত। আমার কাছে যা ছিল তা দিয়ে চেষ্টা করেছি; কিন্তু টাকার অভাবে একটি প্রাণ এভাবে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ছেলের চিকিৎসার জন্য এলাকাবাসী, সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সরকারি সহায়তার আশ্বাস

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উপনাস চন্দ্র দাস বলেন, আমি মাত্র কয়দিন আগে এখানে যোগদান করেছি। এসেই মামুনের বিষয়টি অবগত হই। আমি আমাদের ইউনিয়ন সমাজকর্মীকে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বলেছি। তাকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হবে। আমাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।