যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয়ভাবে শিশুদের সামগ্রিক কল্যাণ ও জীবনযাত্রার মান কমে গেছে। দেশটির অর্ধেকেরও বেশি বা ২৯টি অঙ্গরাজ্যের শিশুরা এখন করোনা মহামারির আগের চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে রয়েছে। অ্যানি ই. কেসি ফাউন্ডেশনের এক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণার মূল ফলাফল
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, শিশুদের কল্যাণ ও সুরক্ষার বিষয়টি সরাসরি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সংকুচিত হয়ে আসায় পরিবারগুলো তীব্র চাপের মুখে পড়ছে।
অ্যানি ই. কেসি ফাউন্ডেশনের বহিঃসম্পর্ক বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লেসলি বোইসিয়েরে বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে যে শিশুরা সুস্থ, নিরাপদ, পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা পায় এবং সুদৃঢ় পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে বড় হয়, স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে সমাজে অবদান রাখার সুযোগ তাদেরই বেশি থাকে।
ফাউন্ডেশনের ‘কিডস কাউন্ট’ ডেটাবুকটি তদারকি করা বোইসিয়েরে আরও বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কর্মবাহিনী, তাই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক শক্তি আজকের শিশুদের কল্যাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পরিমাপের সূচক
অ্যানি ই. কেসি ফাউন্ডেশনের এই বার্ষিক প্রতিবেদনে মূলত চারটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে শিশুদের কল্যাণের মান পরিমাপ করা হয়েছে। সূচকগুলো হলো, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবার ও সমাজ। বোইসিয়েরে জানান, ২০২৬ কিডস কাউন্ট ডেটাবুক-এ ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে মূলত সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বিনিয়োগের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সামগ্রিক স্কোর
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এসে সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গড় স্কোর ৫৫৩ থেকে কমে ৫৪৭-এ নেমে এসেছে। দেশের ২৯টি অঙ্গরাজ্যে শিশুদের জীবনযাত্রার মান কমলেও ১৫টি অঙ্গরাজ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। শীর্ষ অবস্থানে থাকা ৭টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৫টিই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত।
উদ্বেগজনক তথ্য
উদ্বেগজনকভাবে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বোইসিয়েরে বলেন, এই বৃদ্ধি মূলত শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের বিষয়টিকেই সামনে আনে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বেশ কিছু অঙ্গরাজ্য স্কুলগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগে বিনিয়োগ করছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত ব্যয়-ভারে জর্জরিত পরিবারে বসবাসকারী শিশুদের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ শিশুর ওপর। ২০১০ সালের পর এই হারে এমন বৃদ্ধি এবারই প্রথম।
খাতভিত্তিক স্কোর
সামগ্রিক সূচকে স্বাস্থ্য খাতের স্কোর ৬২৪ থেকে কমে ৬০৭ এবং শিক্ষা খাতের স্কোর ৫১৮ থেকে বড় ব্যবধানে কমে ৪১৭-এ দাঁড়িয়েছে। মূলত ৪৭টি অঙ্গরাজ্যে শিশুদের গণিত ও পড়ার দক্ষতা কমে যাওয়ার কারণেই শিক্ষার এই বিপর্যয়। তবে পারিবারিক ও সামাজিক সূচকের স্কোর ৫১৮ থেকে বেড়ে ৬০৮ এবং অর্থনৈতিক কল্যাণের স্কোর ৫৫১ থেকে সামান্য বেড়ে ৫৫৭ হয়েছে।
স্বাস্থ্য বীমা ও খরচ
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ফ্যামিলিজ-এর মে মাসের তথ্যের বরাত দিয়ে বোইসিয়েরে জানান, বর্তমানে চিকিৎসা সহায়তাবিষয়ক সরকারি কর্মসূচি মেডিকেড-এ শিশুদের অন্তর্ভুক্তির হার কমেছে এবং স্বাস্থ্য বিমাহীন শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক এই তথ্য শিশুদের ভবিষ্যৎ কল্যাণের বিষয়ে বেশ কিছু উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিচ্ছে, যখন খাদ্য, আবাসন ও মৌলিক চাহিদার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে।
আঞ্চলিক বৈষম্য
তালিকায় সবচেয়ে নিচে থাকা ১৫টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ১১টিই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। অবশ্য সাউথ ক্যারোলিনাসহ দক্ষিণের ৮টি অঙ্গরাজ্যের স্কোরে উন্নতি দেখা গেছে। সাউথ ক্যারোলিনায় স্কোর বেড়েছে ৩৮ পয়েন্ট, যা যেকোনও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জাতীয়ভাবে তালিকার তলানিতে থাকা রাজ্যগুলোতেও সরকারি নীতি ও অর্থায়ন সরাসরি তরুণদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন, নিউ মেক্সিকো তালিকার ৪৯তম অবস্থানে থাকলেও মূলত অর্থনৈতিক খাতে অগ্রগতির কারণে রাজ্যটির স্কোর ২২ পয়েন্ট বেড়েছে।
সাফল্যের উদাহরণ
সার্বিকভাবে মিসিসিপি ৫০তম অবস্থানে থাকলেও শিক্ষা খাতে তাদের স্কোর ৪৪৪। ২০১৩ সালে রাজ্যটি তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি স্কুল, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে একটি আইন পাস করেছিল, যার সুফল এখন মিলছে।
বোইসিয়েরে বলেন, এটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে যখন আমরা পরিবার ও শিশুদের পেছনে সরাসরি বিনিয়োগ করব, তখন শিশুরা অবশ্যই ভালো করবে।
কিশোরী মাতৃত্বের হার
এর একটি বড় উদাহরণ হলো কিশোরী বয়সে মা হওয়ার হার। এই গবেষণা মেয়াদে এই হার ২৪ শতাংশ কমেছে এবং ১৯৯০ সালের তুলনায় এই হ্রাস প্রায় ৮০ শতাংশ। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১ হাজার কিশোরীর মধ্যে মা হওয়ার হার ১৩ জনে বজায় ছিল। বোইসিয়েরে বলেন, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের হার কমিয়ে আনার জন্য গত কয়েক দশক ধরে যে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা হয়েছে, এটি তারই সরাসরি ফল।
একটি রাজ্য শিশুদের পেছনে কীভাবে এবং কতটা বিনিয়োগ করছে, তার সঙ্গে শিশুরা কেমন আছে, সেটির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



