সন্তানের অবহেলায় মায়ের মৃত্যু: আইনি ফাঁক ও সমাজের ব্যর্থতা
সন্তানের অবহেলায় মায়ের মৃত্যু: আইনি ফাঁক ও সমাজের ব্যর্থতা

রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে গত ৩১ মে ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সন্তানদের ঈর্ষণীয় সাফল্য আর অঢেল প্রতিপত্তির ভিড়ে একজন মায়ের নিঃসঙ্গ ও বিভীষিকাময় মৃত্যুর এই খবর আজ পুরো সমাজকে এক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চারপাশের ঝলমলে উন্নয়ন আর সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের ভিড়ে অবহেলায়, চরম নিঃসঙ্গতায় ফ্ল্যাটের ভেতর মারা গেছেন এক বৃদ্ধা মা। যখন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন তা গলিত ও বিকৃত। যে সন্তানরা সমাজের উঁচুতলায় বসবাস করেন, মায়ের প্রতি তাঁদের এই চরম অবহেলা কেবল এক মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং আমাদের প্রচলিত আইনি কাঠামোর এক মস্ত বড় পরাজয়।

আইনি ফাঁক ও প্রয়োজনীয় সংস্কার

আমরা প্রায়ই দেখি, প্রবীণ মাতা–পিতার ভরণপোষণ বা সুরক্ষার বিষয়টি যখন আসে, তখন আমাদের আইনগুলো গোলকধাঁধায় পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার বা বার্ধক্যজনিত তীব্র অসুস্থতায় ভোগা প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এ ধরনের নির্মম অবহেলার বিচার এবং প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় আমাদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের যুগপৎ এবং সমন্বিত প্রয়োগ আজ সময়ের দাবি।

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের সীমাবদ্ধতা

আমাদের দেশে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা অনেক। কোনো সন্তান যদি মাতা–পিতাকে অবহেলা করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তবে প্রচলিত আইনে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও এর ফলে সেই অপরাধী সন্তানের দেওয়ানি অধিকার—বিশেষ করে মাতা-পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার—বাতিল হওয়ার স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। এটি আইনের এক মারাত্মক ফাঁক। একজন সন্তান মাতা-পিতাকে তিলে তিলে অবহেলা করে মেরে ফেলবে, আবার সেই মাতা-পিতার রেখে যাওয়া বিপুল ধন-সম্পত্তির আইনি অংশীদারও হবে—এমন অন্যায্য ও অনৈতিক দ্বিমুখী নীতি কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। ফৌজদারি আদালত সন্তানকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু ওই মাতা-পিতা মারা যাওয়ার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই সন্তানটি ঠিকই সম্পত্তির সমবণ্টন পেয়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক নজির: রিগস বনাম পালমার

এখানেই দেওয়ানি ও ফৌজদারি উপাদানের আলোকে যুগপৎ বিচারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক আইনি ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এর একটি চমৎকার ও যুগান্তকারী নজির দেখতে পাই। ১৮৮৯ সালে আমেরিকার আদালতে একটি বিখ্যাত মামলা হয়েছিল, যা রিগস বনাম পালমার নামে পরিচিত। সেখানে এক নাতি সম্পত্তির লোভে তার দাদাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছিল। প্রচলিত আইনে তখন খুনের শাস্তি থাকলেও উত্তরাধিকার বাতিলের স্পষ্ট নিয়ম ছিল না। কিন্তু আদালত রায় দেন, কেউ নিজের অপরাধের সুবিধা নিয়ে লাভবান হতে পারে না। এই ঐতিহাসিক রায় থেকেই জন্ম নেয় স্লেয়ার রুল বা ‘হত্যাকারীর নিয়ম’।

আধুনিক আমেরিকায় আইনের বিস্তৃতি

আধুনিক সময়ে এসে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় ও ফ্লোরিডার মতো বহু অঙ্গরাজ্য এই আইনের পরিধি আরও বাড়িয়েছে। বর্তমানে সেখানে শুধু খুন নয়, কোনো সন্তান যদি প্রবীণ মাতা-পিতাকে মারাত্মক অবহেলা, শারীরিক নিগ্রহ বা আর্থিক শোষণ করে, তবে আদালত তাকে উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত বা বারিত করার আদেশ দেন। পশ্চিমা আইন যেখানে প্রবীণদের সুরক্ষায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিধানের এমন যুগপৎ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে, সেখানে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমাদের দেশেও ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ সাপেক্ষে আদালত যাতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই সন্তানের উত্তরাধিকারের দেওয়ানি অধিকার কেড়ে নেওয়ার এখতিয়ার বা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, আইনে সেই স্পষ্ট ধারা যুক্ত করা দরকার।

চিকিৎসা ব্যয়ের আইনি জটিলতা

পাশাপাশি আরেকটি বড় আইনি জটিলতা তৈরি হয় চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়ে। যখন কোনো প্রবীণ মা বা বাবা গুরুতর অসুস্থ বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হন, তখন অনেক সময় দেখা যায় ভাইবোনদের মধ্যে কেবল একজনই মানবিক কারণে সব দায়িত্ব ও আর্থিক বোঝা বহন করছেন। অন্য সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানেরা দূর থেকে কেবল তামাশা দেখেন বা দায় এড়িয়ে যান। দেওয়ানি আইন অনুযায়ী, পিতার মৃত্যুর পর তাঁর দেনা মেটানো সন্তানদের জন্য বাধ্যতামূলক। তাহলে জীবিত অবস্থায় পিতা বা মাতার চিকিৎসায় যে সন্তান একা খরচ বহন করলেন, সেই ব্যয়ভার কেন অন্য ভাইবোনদের ওপর মাতা-পিতার ‘দেনা’ হিসেবে বর্তাবে না? মাতা-পিতার ভরণপোষণ আইনে এই বিষয়ে স্পষ্ট সংশোধনী আনা জরুরি, যাতে দায়িত্ব পালনকারী সন্তান অন্য ভাইবোনদের কাছ থেকে আইনিভাবে এই ব্যয়ের সমবণ্টন বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।

রাষ্ট্রের কর্তব্য ও সমাজের দায়িত্ব

যেসব প্রবীণ নাগরিক একসময় তাঁদের সোনালি যৌবনের মেধা ও শ্রম দিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের থাকা সত্ত্বেও তাঁদের গলিত লাশ উদ্ধার হওয়া রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক। কেবল নৈতিকতার বাণী শুনিয়ে এই অবক্ষয় রোধ করা যাবে না।

আইনি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা

প্রবীণদের সুরক্ষায় মানসিক স্বাস্থ্য আইন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন এবং উত্তরাধিকার আইনের মধ্যে একটি যুগপৎ আইনি সেতু তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—যে সন্তান মাতা-পিতার দায়িত্ব নেবে না, মাতা-পিতার সম্পত্তিতেও তার কোনো অধিকার থাকবে না। আইনগত ও আর্থ-সামাজিক সুরক্ষার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রবীণদের শেষ দিনগুলোকে অন্তত একটু নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করতে পারে।

ইমদাদুল হক তালুকদার
মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
মতামত লেখকের নিজস্ব