হামের ভয়াবহ যন্ত্রণায় হু হু করে কাঁদছিলেন লিপি আক্তার (৩৬)। তিনি বলছিলেন, 'হামে যে এত কষ্ট, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমি যে কষ্ট করেছি, এই কষ্ট আল্লাহ কাউরে না করাক। কী যে ভোগাটা ভুগতেছি, আল্লাহ তুমি আমারে রহমত করো।' আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের চতুর্থ তলায় এই দৃশ্য দেখা যায়। লিপি আক্তারকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তাঁর বড় বোন শিল্পী আক্তার, যিনি তাঁকে দুপুরের খাবার খাইয়ে দিচ্ছিলেন।
লিপি আক্তারের অসুস্থতা ও চিকিৎসা
শিল্পী আক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গত ২৭ মে এই হাসপাতালে এসেছেন তাঁরা। এর আগে ২২ মে অসুস্থ হন লিপি আক্তার। প্রথমে হামের বিষয়টি বুঝতে পারেননি। জ্বর ও অন্যান্য রোগ ভেবে তিন দিন কুমিল্লা ময়নামতি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কোনো উন্নতি না দেখে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। শেষে ২৯ মে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে আনা হয়। এখানে এসে লিপি আক্তারকে চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে গতকাল রোববার বিকেলে তাঁকে চতুর্থ তলার ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। আইসিইউতে থাকার সময়ের কথা মনে করে লিপি আক্তার বলেন, 'কখনো এ রকম হাম হবে ভাবি নাই। করোনার মতো ভয়াবহ, আত্মীয়স্বজন কেউ আসে না। সবাইকে দূরত্বে থাকতে হয়।'
হাসপাতালে হামে আক্রান্ত অন্যান্য রোগী
লিপি আক্তারের মতো হামে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন গাজীপুরের রহিমা আক্তার (৪০), নরসিংদীর মাহমুদুল হাসান (৩২)সহ প্রাপ্তবয়স্ক অন্তত ৪৪ জন মানুষ। হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। টিকার মাধ্যমে বাংলাদেশ একসময় এই রোগ নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। কিন্তু গত বছর টিকা প্রদানে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এবার দেশে ব্যাপক হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইতিমধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৫৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত ও আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু। হাম নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চললেও এখনো সংক্রমণ কমেনি। প্রতিদিন হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
শিশুদের দুর্ভোগ
হাসপাতালের চতুর্থ তলায় লিপি আক্তারের পাশের কক্ষে দুটি শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে হামে আক্রান্ত দুই বোন জাকিয়া (১১) ও সাফিয়া (৬)। যন্ত্রণায় তারা কাতরাচ্ছিল। তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন মা নূরজাহান বেগম। তিনি জানান, তাঁরা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে এসেছেন। দুই মেয়েকে গত শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি করেন। এর আগে তাঁর বড় মেয়ে হাবিবার (১৩) হাম হয়েছিল। নূরজাহান বেগম বলেন, 'ওরে নিয়ে এই হাসপাতালে আসছিলাম। সে সুস্থ হলে ঈদের তিন দিন আগে বাড়ি ফিরি। বাড়ি যাওয়ার দুই দিন পর দেখি, এই দুই মেয়েও আক্রান্ত। পরে তাড়াতাড়ি করে তাদের এই হাসপাতালে নিয়ে আসি।' পরপর তিন মেয়ে হামে আক্রান্ত হওয়ায় খুব ভোগান্তি হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, 'দুইটা বাচ্চারে একসঙ্গে বাসায় রাইখা সেবাযত্ন করা, সংসারের কাজ করা, আবার হাসপাতালে আনার পর সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে হয়। সব মিলায়া অনেক কষ্ট হইয়া যাচ্ছে।'
হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি
দেশে হামের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে ৬ হাজার ৭৫৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৪১ জন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন চার শতাধিক হামের রোগী, যাদের মধ্যে ৪৮ জন আইসিইউতে আছে।



