জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ: শুধু টিকা নয়, দরকার সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ: শুধু টিকা নয়, প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল

সম্প্রতি গাইবান্ধায় কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত পাঁচজন মানুষকে টিকা দেওয়ার পরও বাঁচানো যায়নি। ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কিন্তু একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা। কারণ, জলাতঙ্ক (র‍্যাবিস) এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যার উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর মৃত্যুহার প্রায় শতভাগ। অথচ এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। তাহলে প্রশ্ন হলো, এখনো কেন মানুষ জলাতঙ্কে মারা যাচ্ছে?

বাস্তবতা হলো, আমরা জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণকে মূলত টিকাদানের একটি সীমিত কর্মসূচি হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ইস্যু, যেখানে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই শুধু পথকুকুরকে টিকা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

বাংলাদেশে জলাতঙ্ক পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই জলাতঙ্ক–ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ কুকুর বা অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের শিকার হন। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুর বেশির ভাগই ঘটে কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রামীণ এলাকায় সমস্যা আরও প্রকট। কারণ, সেখানে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন, পর্যাপ্ত টিকা সব সময় মজুত থাকে না, অনেক মানুষ এখনো কুসংস্কার বা ভুল চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন এবং কামড়ের পর তাৎক্ষণিক ক্ষত পরিষ্কার করার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা কম। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পথকুকুর সমস্যা কেন বাড়ছে

বাংলাদেশে পথকুকুর বা স্ট্রিট ডগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কয়েকটি কারণে: শহর ও গ্রামে উন্মুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সহজলভ্য খাদ্য উৎস (বিশেষ করে আবর্জনা), অনিয়ন্ত্রিত পোষা কুকুর পালন, পোষা প্রাণীর নিবন্ধন ও টিকাদানের অভাব এবং নির্বীজন কর্মসূচির সীমিত পরিসর। ফলে পোষা ও পথকুকুরের মধ্যে একটি মিশ্র সংক্রমণ চক্র তৈরি হচ্ছে, যা জলাতঙ্কঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শুধু টিকা যথেষ্ট নয়

গত কয়েক বছরে গণটিকাদান কর্মসূচি কিছু অগ্রগতি আনলেও তা যথেষ্ট নয়। কারণ, কুকুরের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, টিকাদান সব এলাকায় সমানভাবে হয় না, নতুন জন্ম নেওয়া কুকুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যায়, পোষা প্রাণীর বড় অংশ টিকার আওতার বাইরে এবং কামড়ের পর চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে শুরু হয়। ফলে রোগের সংক্রমণ চক্র পুরোপুরি ভাঙা যাচ্ছে না।

সমাধান কী হওয়া উচিত

১. জাতীয় পথকুকুর ব্যবস্থাপনা নীতি

একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি জরুরি, যেখানে থাকবে পথকুকুরের বৈজ্ঞানিক গণনা, নিয়মিত টিকাদান, নির্বীজন কর্মসূচি, দায়িত্বশীল পোষা প্রাণী পালন এবং তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ।

২. নির্বীজন কর্মসূচি জোরদার করা

শুধু টিকা নয়, কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নির্বীজন অপরিহার্য। এটি ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যাবে।

৩. পোষা প্রাণীর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা

পোষা কুকুরের নিবন্ধন, টিকা সনদ বাধ্যতামূলক, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিচয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো নিশ্চিত না করলে রোগ নিয়ন্ত্রণ অসম্পূর্ণ থাকবে।

৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা

পথকুকুরের খাদ্যের প্রধান উৎস হলো উন্মুক্ত বর্জ্য। তাই নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, উন্মুক্ত ডাম্পিং বন্ধ এবং শহর ও গ্রামে পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো পথকুকুরের সংখ্যা কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

৫. কামড়ের পর চিকিৎসা নিশ্চিত করা

অনেক মৃত্যু ঘটে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে। তাই সঙ্গে সঙ্গে ক্ষত ধোয়া, দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং পূর্ণ ভ্যাকসিন কোর্স সম্পন্ন করার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা দরকার।

৬. সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি

জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে আলাদা আলাদা উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দরকার জনস্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাণী কল্যাণ সংগঠনের সমন্বিত কাজ।

গাইবান্ধা আমাদের কী শেখাল

গাইবান্ধার পাঁচটি মৃত্যু কেবল পাঁচটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের নীতিগত সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। আমরা যদি এখনই সমন্বিত ব্যবস্থা না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জনস্বাস্থ্য খাতে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণেও সফল হওয়া সম্ভব, যদি আমরা শুধু ‘কুকুর মারো’ বা ‘শুধু টিকা দাও’ ধরনের অস্থায়ী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করি।

জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ আসলে শুধু একটি রোগ নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি একটি সভ্য, দায়িত্বশীল ও বৈজ্ঞানিক সমাজ গঠনের পরীক্ষাও।

ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।