দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালগুলোতে শিশুদের বাঁচাতে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক মা-বাবা। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এক মায়ের সাথে কথা হয়, যিনি গাজীপুর থেকে এসেছেন। গরমের মধ্যেও বড় হিজাব দিয়ে শরীর ঢেকে বিছানায় ছেলের পাশে বসে আছেন। চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বয়স খুব বেশি হলে ২৪ বছর, লিকলিকে স্বাস্থ্য। তিনি জানান, স্বামী চাননি বলে হামে আক্রান্ত শিশুটিসহ তাঁর চার সন্তানের কাউকে কোনো টিকা দেওয়া হয়নি।
মায়েদের অবস্থা
হামে আক্রান্ত শিশুদের খোঁজ নিতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একাধিক মায়ের সাথে এক মাসের বেশি সময় ধরে কথা হচ্ছে। এই মায়েদের বেশির ভাগেরই পরিবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। নিজের শারীরিক গঠন ঠিক রাখা বা ফিটনেস নিয়ে চিন্তা করার ফুসরত তাঁদের নেই। বাজারের শিশুদের জন্য তৈরি ফর্মুলা বা গুঁড়া দুধের দাম দেখে মনে হয়নি যে তাঁদের তা কেনার সামর্থ্য আছে।
বিতর্কের সূত্রপাত
হামে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে ১৩ মে ইনকিলাব মঞ্চের এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘ফিটনেস হারানোর ভয়ে’ সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না ৫৫ শতাংশ মা। পরদিন তিনি ফেসবুক পোস্টে বক্তব্যের সংশোধনী দেন, উল্লেখ করেন ডয়চে ভেলের একটি ‘গবেষণায়’ দেখা গেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ মা শিশুদের বুকের দুধ পান করাচ্ছেন না। তবে তিনি বুকের দুধ না খাওয়ানোর সঙ্গে নারীদের ফিটনেস-চিন্তার বিষয়টি বলেননি।
প্রাদুর্ভাবের চিত্র
প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত সাড়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত ও সন্দেহজনক সংক্রমণের রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। ১৫ মে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, ওই হাসপাতালে ১ হাজার ৪৫টি শিশু ভর্তি হয়েছিল, মারা গেছে ৪৭টি। আক্রান্ত ও মারা যাওয়া শিশুদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে আসা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
১৭ মে ‘হাম ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হামে শিশুমৃত্যু ও শিশুর অপুষ্টির জন্য মায়েদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, বাচ্চাদের পুষ্টির অভাব, মায়েদের শরীরেও পুষ্টি নেই, কোনো স্বাস্থ্য নেই, চোখ গর্তে, চামড়া উষ্কখুষ্ক, হাড্ডি দেখা যায়। এই মায়েরা ব্রেস্ট ফিডিং করান না।
বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমছে
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ০-৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৬৫ থেকে ৫৫ শতাংশ হয়েছে। বাড়িতে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৯ শতাংশ থেকে নেমে ৪০ শতাংশে এসেছে। তবে এই প্রতিবেদনে মায়ের ফিটনেস বা শারীরিক সক্ষমতা–সংক্রান্ত সরাসরি কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
ফিটনেস বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশ ব্রেস্টিফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশীদ জাহান বলেন, ফিটনেসের বিষয়টি উচ্চবিত্ত মায়েদের মধ্যে থাকলেও তা ৫ শতাংশের বেশি হবে না। তুরস্কের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মায়েদের নিজের শরীর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা বেশি থাকলে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ে, তবে ৫১ শতাংশ নারী জানান বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকায় খাওয়ানো বন্ধ করেন।
মূল কারণ টিকাদানে ঘাটতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যা হামের প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক কারণ। ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া বলেন, তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকার ঘাটতি নিয়ে সতর্ক করেছিল।
মায়েদের পুষ্টিহীনতা
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৩ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী অন্তত ৪ বার প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করেছেন মাত্র ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মা।
নারীদের দোষারোপের কৌশল
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি চিকিৎসক ফওজিয়া মোসলেম বলেন, হামে সন্তান মারা যাওয়ার জন্য মায়েদের দায়ী করে বিভিন্নজন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা ঘটনাকে আড়াল করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাল্যবিবাহের শিকার একজন মায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটুকু? এই মায়েদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সক্ষমতা আছে কি না, তা–ও দেখতে হবে।



