হামে জীবনের বিপর্যয় লইয়া ইত্তেফাক গতকাল দুইটি প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। সংবাদের ছবিগুলির দিকে কিছুক্ষণ তাকাইয়া থাকিলে এবং সংবাদ ক্যাপশন ও শিরোনামগুলি পড়িলে যে কোনো সংবেদনশীল মন বেদনার্ত হইয়া উঠিতে বাধ্য; যেমন—‘বোনের কোলে থাকা শিশু তামজিদ এখন লাইফসাপোর্টে। একই বিছানায় যমজ দুই শিশু রাইসা ও রামিসা। রাইসা লড়ছে হামের বিরুদ্ধে। দুই সন্তানের পাশে অসহায় মা।' আবার খবরের শিরোনামও বড় বেদনাময়—‘লাইফ সাপোর্টে তামজিদ, অশ্রুসজল প্রার্থনায় বাবা-মা । হামে হারানো সন্তানদের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন বাবা-মায়েরা।' শুধু বিভিন্ন পত্রিকার হামসংক্রান্ত খবরের শিরোনাম তুলিয়া দিলেই হয় । ইহা লইয়া এখন আর বেশি কিছু লিখিবার প্রয়োজন হয় না। এক একটি হাম আক্রান্ত পরিবারের এক একটি কাহিনি বড় কষ্টের। যেই সকল গরিব-দুঃখী মা-বাবা শিশুদের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করিতে দিগবিদিক ছুটাছুটি করিতেছেন, তাহাদের মনের ভাষা আমরা কতটা পাঠ করিতে পারিতেছি?
হামের ভয়াবহতা ও সংক্রমণ
চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। ইহা দ্রুত ছড়াইয়া পড়ে । এক জন হামে আক্রান্ত রোগী ১২ হইতে ১৮ জনকে সংক্রমিত করিতে পারে। হামের জটিল রূপ হইতেছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, খিঁচুনিসহ নানা উপসর্গ । গতকাল ইত্তেফাকের অনলাইনের খবরে বলা হইয়াছে যে, দেশে হাম ও হামের উপসর্গ লইয়া মৃত্যু হইয়াছে আরও ১১ শিশুর । ইহার মধ্যে হামের উপসর্গে ৯ জন এবং নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হইয়া দুই শিশুর মৃত্যু হইয়াছে।
সরকারি তথ্য ও টিকাদান কর্মসূচি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হইয়াছে, গত ১৫ মার্চ হইতে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ লইয়া মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ৪৭৫ জনে। ইহার মধ্যে ৭৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হইয়াছে । একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হইয়াছে ১ হাজার ২৬৪ জন । হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছে ১ হাজার ১১৫ জন । এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে, দেশে হাম পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয় নাই । এইদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলিয়াছেন যে, অধিকাংশ জেলায় ১০০ হইতে ১০৪ শতাংশ পর্যন্ত হামের টিকার কার্যক্রম সম্পন্ন হইয়াছে । এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহরে আজ ২০ মে হামের টিকা গ্রহণের শেষ দিন বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে সিটি করপোরেশন । তবে ইহার পরও যাহারা টিকা পাইবেন না, তাহাদের প্রয়োজনে খুঁজিয়া খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে এবং টিকা দিতে হইবে ।
টিকাদানে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
টিকাদান কার্যক্রম নূতন সরকারের সময় বেগবান হওয়াটা আশাব্যঞ্জক। প্রকৃত পক্ষে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে অস্থিরতা, স্বাস্থ্য প্রশাসনে স্থবিরতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে হামের টিকা ক্রয় ও সংগ্রহে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। আশা করি, আমরা শীঘ্রই এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণ লাভ করিব। বাংলাদেশ একদা টিকাদান কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করিয়াছিল; কিন্তু হাম পরিস্থিতি আমাদের সেই সাফল্যকে কিছুটা হইলেও ম্লান করিয়া দিয়াছে।
সংক্রমণের বিস্তার ও আক্রান্ত শিশু
দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলাতেই এই মরণব্যাধির সংক্রমণ ছড়াইয়া পড়িতে দেখা গিয়াছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বৎসরের কম বয়সি নিষ্পাপ শিশু । সরকারি হিসাবে এই যাবৎ ৩২ সহস্রাধিক মানুষ আক্রান্ত হইয়াছে এই রোগে। নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক অদূরদর্শিতায় মানবসৃষ্ট কুফল কেমন হইতে পারে, তাহা আমরা এইবার প্রত্যক্ষ করিলাম। এখন জাতীয় এই বিপর্যয় রোধকল্পে অনতিবিলম্বে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠিতে হইবে । মনে রাখিতে হইবে, শিশুদের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিবার অধিকার কাহারও নাই । তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সব সময় দ্রুত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয় ।



