হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুরা। সেভ দ্য চিলড্রেন ১১ মে ২০২৬ সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছে, গত দুই মাসে নিশ্চিত বা সন্দেহযুক্ত হামে ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। এটাকে শুধু ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ বলা যথেষ্ট নয়, এটি আসলে ইমিউনাইজেশন সিস্টেমের ভেঙে পড়া, প্রশাসনিক বিলম্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সম্মিলিত ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। রোগটি নতুন নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিরোধব্যবস্থায় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছিল। সেই ফাঁকেই শিশুরা মারা যাচ্ছে। এই দুর্বলতার একটি বড় কারণ হলো সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ছড়িয়ে পড়া টিকাবিরোধী প্রচারণা।
টিকাবিরোধী প্রচারণার ইতিহাস ও বর্তমান
বাংলাদেশে টিকাবিরোধী প্রচারণা নতুন কিছু নয়। আমাদের জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখনই রাষ্ট্র বড় আকারে কোনো প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে সামনে এসেছে, তখনই তার বিপরীতে একধরনের সন্দেহ, গুজব, ধর্মীয় আপত্তি আর ষড়যন্ত্রতত্ত্বও তৈরি হয়েছে। পোলিও টিকা নিয়ে হয়েছে, হাম বা শিশুর অন্যান্য টিকা নিয়ে হয়েছে, পরিবার–পরিকল্পনা নিয়েও হয়েছে। এই আপত্তিগুলোর একটা বড় অংশ এসেছে রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিসর থেকে, যেখানে অনেক সময় টিকাকে ‘পশ্চিমাদের এজেন্ডা’ বলা হয়েছে, কখনো ‘হারাম’ বলা হয়েছে, আবার কখনো বলা হয়েছে মুসলমান সমাজকে দুর্বল করার জন্য এগুলো চালু করা হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, তার স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল নেটওয়ার্ক, গণমাধ্যম এবং বহু ক্ষেত্রে সচেতন ইমাম ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের যুক্ত করে এই সন্দেহের বিরুদ্ধে লড়েছে। সে কারণেই বাংলাদেশ আজ এমন এক দেশে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইপিআই কর্মসূচি বহু দশক ধরে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
সাফল্যের পরিসংখ্যান ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০৬ সালে সর্বশেষ ওয়াইল্ড পোলিও ভাইরাস শনাক্ত হয়। ২০১৪ সালে দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সঙ্গে পোলিওমুক্ত স্বীকৃতি পায় এবং এখনো ৯০ শতাংশের বেশি শিশুর কাছে টিকাদান কর্মসূচি পৌঁছায়। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ইপিআই এখন প্রতিবছর আনুমানিক ৯৪ হাজার শিশুর জীবন বাঁচাচ্ছে এবং প্রায় ৫০ লাখ শিশুর অসুস্থতা প্রতিরোধ করছে। অর্থাৎ টিকা এখানে শুধু স্বাস্থ্যসেবার একটি উপাদান নয়, এটি রাষ্ট্রগঠনেরও অংশ। এ কারণেই চিকিৎসা-সংক্রান্ত মিসইনফরমেশন (ভুল তথ্য), ডিজইনফরমেশন (অপতথ্য) আর ম্যালইনফরমেশনকে (বিকৃত তথ্য) হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। সহজ ভাষায় বললে, মিসইনফরমেশন হচ্ছে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা কেউ না বুঝে বা যাচাই না করে ছড়ায়। ডিজইনফরমেশন হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করার জন্য ছড়ানো মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য। আর ম্যালইনফরমেশন হচ্ছে এমন তথ্য, যা আংশিক সত্য বা বাস্তব উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও সেটিকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যাতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, আতঙ্কিত হয় বা কারও সুনাম, প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক স্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইউনেসকো বহুদিন ধরেই ‘ফেক নিউজ’ শব্দটির বদলে এই আলাদা ধারণাগুলো ব্যবহার করতে বলছে। কারণ, সব ভুল তথ্য একই রকম নয়। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালে আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, জনস্বাস্থ্য সংকটে ডিজইনফরমেশন প্রায়ই সরকার, বিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্য সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করার অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বাস্থ্য নিয়ে মিথ্যা তথ্য কেবল ভুল–বোঝাবুঝি নয়, অনেক সময় তা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে দুর্বল করার কাজও করে।
কোভিড-১৯ ও টিকা-সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব
বাংলাদেশে কোভিডের সময় এ জিনিসটা খুব নগ্নভাবে দেখা গেছে। তখন একদল ধর্মীয় বক্তা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব–নির্ভর কনটেন্ট নির্মাতা কোভিডকে কখনো চীনের ওপর ‘আল্লাহর গজব’, কখনো ইরানের ওপর শাস্তি, কখনো পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক পতনের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। পরে যখন রোগটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়ল, তখন একই বয়ান বদলে গিয়ে ‘পরীক্ষা’র কথায় নেমে এল। এর পাশে আরেকটি ধারা চলেছে, সেটি হলো টিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরির রাজনীতি। ‘ফাইভ–জি’ শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, চিপ বসানো হচ্ছে, বন্ধ্যত্ব তৈরি হবে, মুসলমানদের ইমান নষ্ট হবে—এসব হাস্যকর অথচ সামাজিকভাবে বিপজ্জনক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে। এসব বাংলাদেশে শুধু ফেসবুক পোস্টের মধ্যে ছিল না, ইউটিউব, ওয়াজ, অনলাইন আলোচনা, লোকমুখ—সবখানেই ছিল। কোভিড-১৯ টিকা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখিয়েছে যে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা আর অনলাইন বিভ্রান্তি টিকা গ্রহণে অনিচ্ছার বড় চালিকা শক্তি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অ্যান্টিভ্যাকসিন ডিজইনফরমেশন, ফ্যাটালিজম, মিসট্রাস্ট আর সোশ্যাল মিডিয়া ন্যারেটিভস একসঙ্গে কাজ করে।
সামাজিক বিশ্বাসের নেটওয়ার্ক ও টিকার পক্ষে অবস্থান
তবু বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত টিকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এখানে রাষ্ট্রের আগের অভিজ্ঞতাও কাজ করেছে। জনস্বাস্থ্য প্রচারণা শুধু হাসপাতালের ভেতর থেকে চালানো হয়নি, বরং সামাজিক বিশ্বাসের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে চালানো হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় নেতাদের যুক্ত করে টিকাদান নিয়ে যে কাজ হয়েছে, ইউনিসেফ তার বিভিন্ন নথিতে দেখিয়েছে যে পোলিওসহ নানা টিকাদান কর্মসূচিতে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ততা ভ্যাকসিন রিফিউজাল বা টিকা নিতে অস্বীকৃতি কমাতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে এই কৌশল নতুন কিছু নয়। ধর্মীয় আপত্তি যেখানে বাধা হয়েছে, সেখানেই আবার ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশকে জনস্বাস্থ্যের পক্ষে আনা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র বুঝেছে, কেবল তথ্য দিলেই হয় না, বিশ্বাসযোগ্য বাহকও দরকার।
মেডিক্যাল ডিজইনফরমেশনের বিস্তৃতি
এখন যে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে, তা হলো টিকাবিরোধী প্রচারণার বাইরে গিয়ে সামগ্রিক মেডিক্যাল ডিজইনফরমেশন ছড়িয়ে পড়া। অর্থাৎ এখন আর শুধু টিকা নয়, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, বন্ধ্যত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য, ওজন কমানো, প্রসূতিসেবা, এমনকি মেডিক্যাল শিক্ষাও মিথ্যা তথ্যের বাজারে ঢুকে গেছে। ‘লেবু মেশানো পানি’ বা ‘জল চিকিৎসা’ দিয়ে ক্যানসার সারিয়ে ফেলার দাবি ফেসবুক বা ইউটিউবে লাখ লাখ মানুষ দেখছে, শেয়ার করছে। এ ধরনের বক্তব্য শুধু ভুয়া নয়, মারাত্মক। ক্যানসার চিকিৎসা দেরি করানো, রোগীকে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা থেকে সরিয়ে নেওয়া, পরিবারকে ভুল আশায় বেঁধে রাখা এবং পরে চিকিৎসাযোগ্য অবস্থাকে অচিকিৎসাযোগ্য করে তোলার ঝুঁকি এর মধ্যে আছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ধরনের দাবির বিরুদ্ধে একাধিক ফ্যাক্ট চেক হয়েছে। রয়টার্স দেখিয়েছে, লেবু, বেকিং সোডা বা অ্যালকালাইন ডায়েট দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ বা চিকিৎসার দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। একইভাবে জনস হপকিনসের নামে চালানো নানা ‘ক্যানসার আপডেট’ পোস্টও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের কনটেন্টের ভাষা প্রায়ই এমন হয়, যাতে সাধারণ মানুষ মনে করে, ‘বড় ডাক্তাররা সত্য লুকাচ্ছে, আমি গোপন চিকিৎসা বলে দিচ্ছি।’ এই অ্যান্টি-এক্সপার্ট পোস্টারটাই আসল বিপদ।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাস্থ্য-ডিজইনফরমেশন
এই জায়গায় এসে বিষয়টা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও ঢুকে পড়ে। কারণ, জনস্বাস্থ্য একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অবকাঠামো। মানুষ যদি ভুল তথ্যের কারণে টিকা না নেয়, সংক্রামক রোগ বাড়ে। মানুষ যদি প্রতারক চিকিৎসকের কথায় হাসপাতালে না যায়, জটিলতা বাড়ে। যদি গুজবের কারণে কোনো এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাধার মুখে পড়ে, তাহলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। যদি মানুষ পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাকে অবিশ্বাস করতে শেখে, তাহলে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতি, জরুরি প্রতিক্রিয়া, টিকাদান, মহামারি মোকাবিলা, এমনকি দুর্যোগকালে খাদ্য ও ওষুধ বিতরণব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ইনফোডেমিক’ বলতে এ পরিস্থিতিকেই বোঝায়, যেখানে অতিরিক্ত, ভুল, বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী তথ্য এমনভাবে ছড়ায় যে মানুষ নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ডব্লিউএইচওর ভাষায়, এই ইনফোডেমিক নিজেই একটি বড় হেলথ রিস্ক, বিশেষ করে জরুরি অবস্থায়। তাদের আরেকটি সাম্প্রতিক অবস্থান হলো, হেলথ সিকিউরিটি আর ব্রডার সিকিউরিটি আলাদা কিছু নয়। অর্থাৎ জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হলে সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাও দুর্বল হয়।
কেন এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন?
কেন এটাকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন বলতে হবে, সেটার আরও সরাসরি ব্যাখ্যাও আছে। প্রথমত, বড় আকারে স্বাস্থ্যগুজব মানুষের আচরণ বদলায়। পদ্ধতিগত পর্যালোচনা দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য ভুল চিকিৎসা সিদ্ধান্ত, টিকা নিতে অনীহা, মানসিক উদ্বেগ, ঘৃণাত্মক ও বিভাজনমূলক ভাষা এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্পদের ভুল ব্যবহার বাড়ায়। মানুষ অনর্থক আতঙ্কে ওষুধ মজুত করতে পারে, হাসপাতালে ভিড় করতে পারে, আবার জরুরি চিকিৎসা এড়িয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, এতে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে। যখন বারবার বলা হয় ‘ডাক্তাররা মিথ্যা বলছে’, ‘সরকার রোগ বানিয়ে ভয় দেখাচ্ছে’, ‘টিকা আসলে ষড়যন্ত্র’, তখন কেবল একটি নীতি না, পুরো ইনস্টিটিউশন অব ট্রাস্ট দুর্বল হয়। তৃতীয়ত, এই দুর্বলতা বিদেশি বা দেশি রাজনৈতিক অপশক্তি ব্যবহার করতে পারে। ডব্লিউএইচওর মতে ‘ডিজইনফরমেশন ক্যান বি ওয়েপনাইজড’, অর্থাৎ অপতথ্যকে অস্ত্র বানানো যায়। একটি সমাজে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর যদি অবিশ্বাস তৈরি হয়, তাহলে সেই সমাজ মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জৈবিক হুমকির সময় অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
শাস্তির অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়
বাংলাদেশের সমস্যাটা শুধু এই নয় যে কিছু ভুল কথা বলা হচ্ছে। সমস্যাটা হলো, এই ভুল কথাগুলোর জন্য প্রায় কোনো শাস্তি নেই। যে কেউ একটা মাইক্রোফোন, একটা ইউটিউব চ্যানেল, একটা পডকাস্ট বা একটা ক্লিকবেইট থাম্বনেইল নিয়ে স্বাস্থ্য নিয়ে এমন কথা বলে দিচ্ছে, যা একজন মানুষকে চিকিৎসা থেকে সরিয়ে দিতে পারে, নারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দিতে পারে, মেডিক্যাল শিক্ষাকে যৌনতাপূর্ণ কুৎসায় নামিয়ে আনতে পারে বা পরিবারের সিদ্ধান্তকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখানে মিসইনফরমেশন আর মিসোজিনি, ডিজইনফরমেশন আর ‘মোরাল প্যানিক’—সব একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধু মেডিক্যাল বিষয়ে অপতথ্য ছড়ানো নয়, বরং এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও অংশ। একদিকে ‘অলৌকিক চিকিৎসা’, অন্যদিকে ‘ডাক্তার হওয়ার জন্য শারীরিক সম্পর্ক করতে হয়’ ধরনের কনটেন্ট, দুটোই জন–আস্থা ধ্বংস করে। একটিতে মানুষ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর আস্থা হারায়, অন্যটিতে স্বাস্থ্যপেশার সামাজিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুটিই শেষ পর্যন্ত ক্ষতি করে রোগীকে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
রাষ্ট্র যদি খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, নকল ডাক্তার, নকল ডিগ্রি, ভুয়া ওষুধের বিজ্ঞাপন নিয়ে চিন্তা করতে পারে, তাহলে সংগঠিত স্বাস্থ্য-ডিজইনফরমেশন নিয়েও তাকে নীতি নিতে হবে। তবে সেই নীতি যেন কেবল দমনমূলক বা সেন্সরকেন্দ্রিক না হয়। কারণ, সব ভুল তথ্য খারাপ উদ্দেশ্যে আসে না। অনেক মানুষ না বুঝেই শেয়ার করে। তাই আলাদা করতে হবে কারা মিসইনফর্মড ইউজার, কারা রিপিট অফেন্ডার ইনফ্লুয়েন্সার, আর কারা ইচ্ছাকৃতভাবে ডেঞ্জারাস হেলথ ন্যারেটিভস মনিটাইজ করছে। সরকারের কাজ হবে ‘এভিডেন্স-বেজড রিস্ক কমিউনিকেশন’ গড়ে তোলা, দ্রুত ফ্যাক্ট চেকিং এবং ‘কারেকশন মেকানিজম’ তৈরি করা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আইইডিসিআর, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসক সংগঠন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিত করা, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের বিশ্বস্ত অংশকে যুক্ত করা, রিপিট ডিজইনফরমেশন প্রফিটিয়ার্সের বিরুদ্ধে আইনি ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া। সবচেয়ে বড় কথা হলো, জনস্বাস্থ্য শুধু ডাক্তারদের বিষয় না; এটি রাজনৈতিক বিষয়, সামাজিক বিষয়, নৈতিক বিষয় এবং নিরাপত্তার বিষয়। একটি সমাজ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে অসুখের চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং ভাইরাল পডকাস্টে লুকানো আছে, তাহলে সেই সমাজ ধীরে ধীরে প্রতারকদের হাতে বন্দী হয়। আর একটি রাষ্ট্র যদি এই প্রবণতাকে ‘ছোটখাটো অনলাইন কথা’ ভেবে ছেড়ে দেয়, তাহলে পরে তাকে আরও বড় মূল্য দিতে হয়।



