ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে জটিলতা: শিশু ছেলের দাবিতে বাবার মরদেহ দাফন
বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলায় কাজী সোহাগ নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। স্থানীয় প্রশাসন এই সংকটের সমাধান দিয়েছে মৃতের ৯ বছর বয়সী ছেলে আব্দুর রহমানের দাবির প্রেক্ষিতে। শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ মোল্লাহাট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
শিশুর দাবি ও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত
মোল্লাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আইরিন মৃতের ছেলে আব্দুর রহমানের কাছে জানতে চান, ‘তুমি কি চাও?’ তখন আব্দুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি চাই আমার বাবাকে দাফন করা হোক।’ এই ছোট শিশুর দাবির পর প্রশাসন সোহাগের মরদেহটি ছেলের কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এর আগে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সোহাগের মরদেহ দাফন না দাহ করা হবে—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মরদেহ হেফাজতে নেয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে জটিলতায় পড়া ব্যক্তির আসল নাম সুব্রত পোদ্দার কানু। তার বয়স ছিল ৪৩ বছর।
ধর্ম পরিবর্তনের ইতিহাস
সুব্রত পোদ্দার কানু গোপালগঞ্জ জেলার তেঘরিয়া গ্রামের শুকলাল পোদ্দার ও রিতা রানী পোদ্দারের ছেলে। প্রায় ২১ বছর আগে এফিডেভিটের মাধ্যমে তিনি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নিজের নাম পরিবর্তন করে তিনি কাজী সোহাগ নাম রাখেন। পরবর্তীতে তিনি গোপালগঞ্জের মাঠলা তেতুলিয়া এলাকায় মমতাজ মিম নামের এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আব্দুর রহমান নামে একটি ছেলে রয়েছে।
মৃত্যু ও উত্তেজনার পটভূমি
গত বুধবার সন্ধ্যায় মোল্লাহাট উপজেলার দত্তডাঙ্গা রাইরসরাজ সেবাশ্রমে অবস্থানকালে কাজী সোহাগের মৃত্যু হয়। তার মা রিতা রানী পোদ্দার সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সোহাগের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও সন্তানদের না জানিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে মোল্লাহাটের উত্তরআমবাড়ি কালী মন্দির সংলগ্ন শ্মশানে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে দাহ করার জন্য মরদেহ নেওয়া হয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে মৃতের স্ত্রী মমতাজ মিম ও মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে আব্দুর রহমান প্রতিবাদ জানান। তারা মুসলিম ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কবরস্থানে দাফনের দাবি করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ও প্রশাসন ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মায়ের দাবি ও দালিলিক প্রমাণের অভাব
মৃতের মা রিতা রানী পোদ্দার দাবি করেন, তার ছেলে পূর্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং সেই বিবেচনায় দাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তিনি ছেলের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার কোনো দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এই অভাবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মোল্লাহাট থানার ওসি কাজী রমজানুল হক বলেন, ‘মৃতের শিশু ছেলের দাবির পর প্রশাসন সোহাগের মরদেহটি ছেলের কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাকে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।’ এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই ঘটনা ধর্মীয় পরিচয় ও পারিবারিক অধিকারের মধ্যে সমন্বয়ের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। শিশুর দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসন একটি সংবেদনশীল ইস্যুর শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করেছে।



