চিকিৎসক শংকর প্রসাদের দুর্ঘটনা: গাড়ি নেই, জ্বালানি নেই, চালক নেই
ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অর্পিতা হালদার। ভেতরে চিকিৎসাধীন তাঁর স্বামী শংকর প্রসাদ অধিকারী, যিনি পাঁচ দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন। এই ঘটনা চিকিৎসক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলার প্রশ্ন তুলেছে।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
১২ এপ্রিল পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী কমিউনিটি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েন। একটি গরু হঠাৎ পথে চলে এলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান, যার ফলে শংকর প্রসাদের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগে। তিনি বর্তমানে কোমায় রয়েছেন এবং তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
অথচ এই পরিদর্শনে শংকর প্রসাদের মোটরসাইকেলে যাওয়ার কথা ছিল না। কারণ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি গাড়ি রয়েছে। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে গাড়ির চালক ও জ্বালানি বরাদ্দ বন্ধ থাকায় চিকিৎসকেরা গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না। অর্পিতা হালদার বলেন, "গাড়ি থাকলে হয়তো আমার স্বামী এমন দুর্ঘটনায় পড়তেন না।"
স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতা
এই ঘটনা চিকিৎসকদের অবহেলা এবং স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতার নজির হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইউএইচএফপিও কার্যালয়ের গাড়িগুলোর জন্য তেল ও চালক বরাদ্দ বন্ধ হয়েছিল। পটুয়াখালী জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, "গাড়ির চালকের বেতন–ভাতা ও গাড়ির জ্বালানি খরচ দেওয়া গত দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে চিকিৎসকেরা হাসপাতাল পরিদর্শন বা তদারকির কাজে গাড়ি ব্যবহার করতে পারছেন না।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে এ ব্যয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার বিকল্প প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের পরিকল্পনা করছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাড়া
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত ১৪ এপ্রিল চিকিৎসাধীন শংকর প্রসাদকে দেখতে গিয়েছিলেন। মন্ত্রী সরকারি দায়িত্ব পালনে গিয়ে আহত শংকর প্রসাদের চিকিৎসার ব্যয়ভার সরকারের নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
পরিবারের দুর্দশা
শংকর প্রসাদ ও অর্পিতা হালদারের দুই সন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে বড় ছেলে শাশ্বত শুদ্ধ অধিকারী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। অর্পিতা বলেন, "বড় সন্তান বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হওয়ায় তাঁকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত থাকতেন শংকর প্রসাদ। ছেলেদের জন্য হলেও যেন ও ফিরে আসে।" পরিবারটি আগে পটুয়াখালীতে থাকলেও চিকিৎসার সুবিধার জন্য ২০২২ সালে ঢাকায় চলে আসে।
চিকিৎসার অবস্থা
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ জানান, শংকর প্রসাদের মস্তিষ্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মাথার খুলি ফেটে গেছে। তাঁর চেতনার মাত্রা গ্লাসগো কোমা স্কেলে এখন ৬, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা ১৫। অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আরও বলেন, "মাথায় হেলমেট থাকলে আঘাতের মাত্রা কম হতো।" দুর্ঘটনার সময় মোটরসাইকেল চালকের কাছে অতিরিক্ত হেলমেট ছিল না বলে জানা গেছে।
চিকিৎসকদের ক্ষোভ
শংকর প্রসাদের সহকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদমর্যাদা একই হলেও চিকিৎসকেরা গাড়ি ও জ্বালানির সুবিধা পান না। অর্পিতা হালদার বলেন, "স্বামী বলেছিলেন, গাড়ির তেল বেশি লাগে এবং নিজের অর্থে তা খরচ করা কঠিন। এ জন্যই মোটরসাইকেলে চলাচল করতেন।"
এই ঘটনা চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের অবকাঠামোগত সংকটের দিকে আলোকপাত করেছে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে।



