স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে নিজের কিডনি দান করলেন শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন
স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে নিজের কিডনি দান করলেন জসিম উদ্দিন

ভালোবাসার অনন্য নজির: স্ত্রীর জন্য স্বামীর কিডনি দান

ভালোবাসা কেবল মৌখিক অঙ্গীকার নয়, বরং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তা বাস্তব রূপ নিতে পারে। এমনই এক মর্মস্পর্শী ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলেন শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন, যিনি তার স্ত্রী মিনারা বেগমের জীবন বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য সংকট ও চিকিৎসার যাত্রা

গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের স্ত্রী মিনারা বেগম দীর্ঘকাল ধরে উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিকিৎসকরা আবিষ্কার করেন যে, তার দুটি কিডনিই সম্পূর্ণরূপে বিকল হয়ে গেছে। এছাড়াও, তার পেটে একটি টিউমারের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

প্রাথমিকভাবে, ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার মাধ্যমে টিউমারের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান এবং উপযুক্ত ডোনারের অভাবে সংকট গভীর হতে থাকে। প্রথমে মিনারার মা কিডনি দান করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও, তার নিজস্ব শারীরিক সমস্যার কারণে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বামীর সাহসী সিদ্ধান্ত ও সফল অস্ত্রোপচার

এমন সংকটময় মুহূর্তে, স্ত্রীর জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসেন স্বামী জসিম উদ্দিন। তিনি নিজের একটি কিডনি দান করার সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর, গত ৫ মার্চ ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অস্ত্রোপচারের পর থেকে মিনারা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং চিকিৎসকদের কঠোর পরামর্শ অনুসরণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "আমার অসুস্থতার সময় আমরা পরিবারসহ ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। মা কিডনি দিতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। তখন আমার স্বামী নিজেই এগিয়ে আসে। আমি অনেকবার নিষেধ করেছি, কিন্তু সে শোনেনি। এখন আল্লাহর রহমতে আমরা দুজনেই ভালো আছি।"

জসিম উদ্দিনের আবেগঘন বক্তব্য

অন্যদিকে, জসিম উদ্দিন তার এই সিদ্ধান্তের পেছনের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "স্ত্রীর এমন গুরুতর অবস্থায় শুরুতে কী করব তা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তখন আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বাঁচলে একসঙ্গে বাঁচব, মরলেও একসঙ্গে মরব। নিজের সম্পূর্ণ ইচ্ছাতেই আমি কিডনি দিয়েছি। এখন স্ত্রীকে সুস্থ ও স্বাভাবিক দেখতে পারাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।"

২০০৭ সালে বিয়ে হওয়া এই দম্পতির একটি সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জসিম উদ্দিন ঢাকায় চাকরি করে সংসার চালিয়ে আসছেন, যা এই সংকটকালে তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে।

স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক মূল্যায়ন

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সম্প্রদায়ের সদস্যরা এই ঘটনাকে ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের একটি বিরল ও অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেকে এটিকে সামাজিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

উপসংহারে বলা যায়, জসিম উদ্দিনের এই অসামান্য ত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তিগত গল্পই নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের জন্য ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত ভালোবাসা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অপরের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে।