বিপুল বিনিয়োগেও অচল: ছয় জেলায় আধুনিক হাসপাতাল ভবন অব্যবহৃত
দেশের ছয়টি জেলায় সরকারি বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত আধুনিক হাসপাতাল ভবনগুলো বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। রংপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও কুমিল্লায় অবস্থিত এসব হাসপাতালে ভবন থাকলেও কার্যক্রম চালু হয়নি, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।
৩২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়, তবুও অচলাবস্থা
এই ছয়টি হাসপাতাল ভবন নির্মাণে সরকার এখন পর্যন্ত ৩২০ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। মোট শয্যা সংখ্যা ১ হাজার ৫০টি, যার মধ্যে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) অন্তর্ভুক্ত। কোনো হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ৬ বছর আগে, আবার কোনোটি মাত্র ১০ মাস আগে সম্পন্ন হয়েছে। তবুও জনবল, আসবাব, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অর্থ বরাদ্দের অভাবে রংপুর ছাড়া বাকি পাঁচটি হাসপাতাল স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো প্রতিষ্ঠান ভবন বুঝে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
রংপুর: ছয় বছরেও চালু হয়নি শিশু হাসপাতাল
রংপুরের ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ছয় বছর আগে। ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা ব্যয়ে তিনতলা ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মিত হলেও এটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। জেলা সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা জানান, হাসপাতাল চালু না হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ জেলা উন্নয়ন কমিটির সভায় কয়েকবার তুলেছেন তিনি। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বলেন, “জনগণের টাকায় নির্মিত এত সুন্দর হাসপাতালটি কেন, কার অযোগ্যতায় চালু হলো না, এটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নাকি দায়িত্বহীনতা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।”
খুলনা: ভবন বুঝে নেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ
খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে এখনো সেবাদান চালু করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভবন হস্তান্তরের জন্য একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তা বুঝে নেয়নি। খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, “হাসপাতাল ভবনের প্রাচীর নেই, ফটক নেই, লোকবল নেই। উন্মুক্ত ও অরক্ষিত অবস্থায় এটি পড়ে আছে।”
রাজশাহী: চুরির ঘটনায় জর্জরিত
রাজশাহীতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শিশু হাসপাতালের ভবনটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের বাইরের ফিটিংস রাতে চুরি হয়ে যাচ্ছে, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও বাল্ব চুরি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ফরহাদ সরকার বলেন, “হাসপাতাল ভবন আমাদের পক্ষে আর পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।”
সিলেট: পরিচালনা করবে কে—ঠিক হয়নি
সিলেট নগরে হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার দুই বছর হতে চলেছে। তবে কোন দপ্তর নতুন হাসপাতালটি পরিচালনা করবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। ২৫০ শয্যার আটতলা ভবনটি পড়ে রয়েছে জটিলতায়। গণপূর্ত অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু জাফর বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিষ্ঠান এটি বুঝে নিতে রাজি হয়নি।
কুমিল্লা ও বরিশাল: একই চিত্র
কুমিল্লায় ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল ১০ মাস আগে নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি। আসবাব ও যন্ত্রপাতির অভাবে কোনো দপ্তর ভবনটি বুঝে নেয়নি। অন্যদিকে, বরিশালে ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালের নির্মাণকাজ প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়েছে, কিন্তু জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে চালু করা যায়নি।
সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, “বিগত সরকারের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এসব হাসপাতালের ভবন তৈরি করা হয়। হাসপাতাল কীভাবে চলবে, তা চিন্তা করা হয়নি।” তিনি আরও যোগ করেন, হাসপাতাল চালু করতে প্রশাসনিক অনুমোদন, জনবলের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান মন্তব্য করেন, “কয়েকটি হাসপাতাল তৈরি করার পর সেগুলো হস্তান্তরজনিত যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের চরম উদাসীনতা এবং অদক্ষতার নমুনা প্রকট হয়ে উঠেছে।”
বর্তমানে হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের অবকাঠামো পড়ে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ ও হতাশা আরও গভীর হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।



