মৌলভীবাজারে হাসপাতাল বন্ধে চা শ্রমিকদের চিকিৎসাসঙ্কট, মৃত্যু ৫
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর চা বাগান এলাকায় অবস্থিত ‘ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল’ টানা ১৬ দিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম চিকিৎসাসঙ্কট দেখা দিয়েছে। গত ২৬ মার্চ থেকে হাসপাতালের সেবা বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে এ পর্যন্ত ৫ জন চা শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মৃত্যুর ঘটনা ও শ্রমিকদের অভিযোগ
স্থানীয় চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন জানিয়েছেন, হাসপাতাল বন্ধ থাকায় পালকিছড়া চা বাগানের রুমি ভর (২৩), কানিহাটি চা বাগানের মাধুরী তেলী (৪০) ও লক্ষীমুনি তেলী (৮০) এবং আলীনগর চা বাগানের রাজদেব কৈরীসহ (৫৮) মোট পাঁচজন মৃত্যুবরণ করেছেন। সঠিক সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়াকেই তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়ী করছেন শ্রমিকরা।
সীতারাম বীন বলেন, “ক্যামেলিয়া হাসপাতালে দ্রুত চিকিৎসাসেবা শুরু করতে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি, অতীতের মতো সব ধরনের অপারেশন চালুসহ শিশু মৃত্যুর কারণ তদন্ত, হাসপাতালে সংঘটিত অপ্রীতিকর ঘটনার তদন্তসহ সব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ঘটনার সূত্রপাত ও হাসপাতাল বন্ধের কারণ
গত ২৬ মার্চ ঐশি রবিদাস (১৩) নামের এক কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। মাথাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ঐশির অবস্থা অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে জেলা সদরে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবার রাজি না হওয়ায় পরদিন হাসপাতালেই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে একদল লোক হাসপাতালে হামলা ও চিকিৎসকদের হেনস্তা করে। এরপরই নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে চিকিৎসক ও কর্মচারীরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন এবং কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
হাসপাতালের গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা
নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি চা শ্রমিক, তাদের পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। নারী শ্রমিকরা আক্ষেপ করে বলেন, “এই হাসপাতালই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। কোনও অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে পারতো, কিন্তু এভাবে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা পুরোপুরি চিকিৎসা বঞ্চিত।”
শুধু হাসপাতাল নয়, একই ফাউন্ডেশনের অধীনে থাকা ‘লংলা ক্যামেলিয়া স্কুল’ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। শ্রমিকরা বলছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুই খাতেই সেবা বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে চা শ্রমিক পরিবারগুলোর সন্তানরা। ঘটনার পর ২৯ মার্চ শমশেরনগর চা বাগানে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইংল্যান্ডে অবস্থিত ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নির্দেশনা ছাড়া কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে ঘটনাটির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী দ্রুত সেবা চালুর দাবি জানিয়ে বলেন, হাঙ্গামা না করে তদন্তের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক ও ডানকান ব্রাদার্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান জানান, হাসপাতালটি একটি স্বতন্ত্র ফাউন্ডেশনের অধীনে হওয়ায় তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই, তবে দুর্ভোগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “শ্রমিক নেতারা আমার কাছে এসেছিলেন। আমি দ্রুত হাসপাতালটি চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করছি। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যেই চা শ্রমিকরা আবার সেবা পাবেন।”



