রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা সংকটে এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু
রাজশাহী মেডিক্যালে আইসিইউ সংকটে ২২৯ রোগীর মৃত্যু

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা সংকটে এক মাসে ২২৯ রোগীর মৃত্যু

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আইসিইউ শয্যা না পেয়ে অপেক্ষায় থেকে গত মার্চ মাসে মোট ২২৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯১ জন শিশু রয়েছে। হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সংকট মোকাবিলায় ১০০ শয্যার নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব গত রবিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

আইসিইউ শয্যার বর্তমান অবস্থা ও চাহিদা

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা মাত্র ৪০টি। এর মধ্যে শিশুদের জন্য ১২টি, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য ১৬টি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২টি শয্যা বরাদ্দ রয়েছে। তবে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে শিশু আইসিইউর শয্যার সংখ্যা ছয়টি বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে। তবুও সংকট কাটছে না, এবং আইসিইউ শয্যা না পেয়ে অপেক্ষায় থেকে রোগীদের মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে।

মার্চ মাসের পরিসংখ্যান ও মৃত্যুর হার

রামেক হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, মার্চ মাসে শিশু আইসিইউয়ে ভর্তি ছিল ১১৯ শিশু, অথচ অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮৬ শিশু। তাদের মধ্যে ৯১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মধ্যে ভর্তি ছিলেন ১৪৩ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩০২ জন, যাদের মধ্যে ৭০ জন মারা গেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ভর্তি ছিলেন ১৩৫ জন এবং অপেক্ষায় ছিলেন ৩১২ জন, তাদের মধ্যে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামের প্রকোপ ও চিকিৎসকদের বক্তব্য

চিকিৎসকদের মতে, হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ায় শিশুদের জটিলতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আইসিইউর চাহিদা হঠাৎ করে বাড়িয়ে দিয়েছে। সময়মতো কাউকে আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস জানান, সংকট নিরসনে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। শিশু আইসিইউ শয্যা আগে ১২টি থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি শয্যা শুধুমাত্র হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত।

রোগীদের স্বজনদের করুণ অভিজ্ঞতা

আইসিইউ সংকটের করুণ চিত্র উঠে এসেছে রোগীদের স্বজনদের বক্তব্যে। কুষ্টিয়ার বাসিন্দা রিফাতের পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল এবং আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় তার সিরিয়াল ছিল ৩২। পরে তার মেয়েটি মারা যায়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আইসিইউতে একটি শয্যার জন্য বহু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা করা যায়নি। আমার মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারলাম না।’ এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয় মাস বয়সী এক শিশু আইসিইউর অপেক্ষমাণ তালিকায় ৩১ নম্বরে থেকে মারা যায়, এবং একই দিনে ৩০ নম্বরে থাকা আরেক শিশু হুমায়রারও মৃত্যু হয়।

হাসপাতালের অবকাঠামো ও অতিরিক্ত চাপ

১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২০১৩ সালে এক হাজার ২০০টিতে উন্নীত করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে শিশু আইসিইউতে মোট ১৮টি শয্যার মধ্যে ১২টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এবং ছয়টি অন্যান্য রোগীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন, ফলে চাপ আরও বেড়েছে।

চাহিদা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগ

এ অঞ্চলে শিশু আইসিইউ সুবিধা সীমিত হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি শয্যার চাহিদা থাকে। তবে মার্চ মাসে হঠাৎ করে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫০টিতে পৌঁছেছে, যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আশা করছেন, নতুন আইসিইউ স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এই সংকট কিছুটা লাঘব হবে এবং রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।