চট্টগ্রামে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব: স্থানীয় পরীক্ষার অভাবে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব
চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে রোগ শনাক্তের জন্য কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল)। অথচ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) হাম রোগ শনাক্তের মতো ল্যাব সুবিধা থাকলেও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
হাম শনাক্ত ও ভর্তির হালনাগাদ পরিসংখ্যান
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও চার জনের শরীরে হাম রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রামে মোট ১২ জনের শরীরে রোগটি শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়াও গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা নিয়ে মোট ৮৭ জন চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে ওই সময়ে জেলার উপজেলাগুলোতে হাম সন্দেহে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়নি।
অপরদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার জন্য ৩২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার এনপিএমএল ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ১৫৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার এনপিএমএল ল্যাবে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে নগরের ৭০ জন এবং জেলার বাসিন্দা ৮৫ জন অন্তর্ভুক্ত।
স্থানীয় পরীক্ষার অভাব ও চিকিৎসায় বিলম্ব
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে বর্তমানে ল্যাবে হাম রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে না। চট্টগ্রামে ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) ল্যাবে। সেখান থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট চলে আসছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হাম ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে তখন হয়তো চট্টগ্রামে পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক শিশুর বাবা জানান, নমুনা সংগ্রহের পর তিন-চার দিন পর রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে, যা রোগ নির্ণয়ে দেরি ঘটাচ্ছে এবং চিকিৎসা শুরুতেও বিলম্ব সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে এই সমস্যাটি থাকতো না।’
বিআইটিআইডি ল্যাবের সুবিধা ও বর্তমান সীমাবদ্ধতা
২০১৩ সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিআইটিআইডিতে হাম ও রুবেলাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা রয়েছে। এ হাসপাতালে অত্যাধুনিক রিয়েল-টাইম পিসিআর মেশিন এবং অ্যালাইজা মেশিনের পাশাপাশি যক্ষ্মা শনাক্তে জিন এক্সপার্ট, রক্ত পরীক্ষার জন্য অটোমেটেড অ্যানালাইজার মেশিনসহ বিশ্বমানের ‘রডলফ মেরিয়ো ল্যাবরেটরি’র সুবিধা বিদ্যমান।
বিআইটিআইডি’র অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৯৯ শতাংশ চিকিৎসকই রোগীর উপসর্গ দেখে হাম শনাক্ত করতে পারেন, কারণ হাম একটি পরিচিত এবং পুরাতন রোগ। হামের প্রধান তিনটি লক্ষ্মণের মধ্যে রয়েছে, বেশি মাত্রায় জ্বর, কাশি এবং শরীরে রেশ থাকবে। সাধারণত হাম রোগীদের র্যাশ মুখ এবং কান দিয়ে শুরু হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিআইটিআইডি হাসপাতালের ল্যাবে হাম পরীক্ষা সম্ভব, কিন্তু হাম-রুবেলা পরীক্ষার জন্য কিট নেই। কিটের জন্য ইতিমধ্যে আমরা ঢাকায় চিঠি লিখেছি। কিট এবং অনুমোদন পেলে পরীক্ষা শুরু করা যাবে।’
এই পরিস্থিতি চট্টগ্রামে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রোগ নির্ণয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।



